| টাইম ম্যানেজমেন্ট |
টাইম ম্যানেজমেন্ট
লেখক : ইসমাইল কামদার
প্রকাশনী : সিয়ান পাবলিকেশন
বিষয় : আত্মশুদ্ধি ও অনুপ্রেরণা
আরো পড়ুন-
টাইম ম্যানেজমেন্ট: ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে সময়ের বরকতকে বোঝার নতুন পাঠ
আমরা সবাই শুনি—সময় নেই, হাতে কম সময়, জীবনে সময়ের বারাকাহ নেই। কিন্তু আসলেই কি আমরা এতটা ব্যস্ত, নাকি শুধু নিজেকে ব্যস্ত মনে করি? আজকের এই প্রযুক্তির যুগে, যখন চোখের সামনে বিশাল দুনিয়া হাতের মুঠোয় চলে আসে, তখনও মনে হয় সময়টা হাতে ধরে রাখা বেশ কঠিন। এই চ্যালেঞ্জটা অনেক পুরাতন, কিন্তু আধুনিক জীবনে যেন আরও হালকা চুপসে যাওয়া বলের মতো যেন সময়টা হাতছাড়া হয়ে যায়। এইজায়গা থেকেই ইসলামী স্কলার উস্তাদ আবু মুআবিয়া ইসমাইল কামদার তার বই “টাইম ম্যানেজমেন্ট”-এ খোঁজার চেষ্টা করেন, কীভাবে একজন মুসলিম হিসেবে আমরা সময়কে দেখব, কীভাবে সময়ে বরকত আনব। সিয়ান পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত এই বইটা মুহাম্মাদ ইফাত মান্নান বাংলায় অনুবাদ করেছেন, সহজ ও সাধারণ ভাষায়। মাত্র ১৩২ পৃষ্ঠা, কিন্তু প্রতিটা পাতাতেই কথাগুলো বেশ সরল, পাঠকের মনে গেঁথে যায়।
এই বইয়ের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে সময় ব্যবস্থাপনা নিয়ে চিরাচরিত উৎপাদনশীলতা গল্প নেই। বরং, লেখক খোলাসা করে বলেছেন, একজন মুসলিমের জন্য সময় মানে শুধু কাজের তালিকা শেষ করা না, বরং এই সময়টাই আসলে আল্লাহর দেয়া একটা আমানত। কুরআন-হাদিসের আলোকে লেখক দেখান পূর্ববর্তী আলেম ও মনীষীরা কত ব্যস্ততার ভেতরেও ইলম আর দ্বীনি খেদমতে সময়কে ব্যয় করেছেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)—ব্যবসা নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকলেও ইলমে ছিলেন তার চেয়েও বড়। ইবনুল মুবারক (রহ.) ব্যাবসা করেছেন, আবার ফিকহ-হাদিসে ছিলেন ইমাম। এসব দৃষ্টান্ত আমাদের মনে জোর দেয়, ব্যস্ততা কখনো সফলতার প্রতিবন্ধকতা না। যদি ঠিকঠাক পরিকল্পনা থাকে, তা হলে অনেক চাপের ভেতরও অর্থবহ কাজ করা সম্ভব।
এই বইয়ের শুরুতেই একটা সুন্দর ব্যাপার নজর কেড়ে নেয়। এটা জোর করে বলে না, কীভাবে পড়তে হবে। কেউ চাইলে একেবারে দ্রুত পড়ে শেষ করতে পারেন, কেউ চান গভীরভাবে, আবার কেউ শুধু দরকারি অধ্যায়গুলো পড়ে নিলেই চলবে। এমন নমনীয়তা খুব বেশি বইয়ে দেখা যায় না। পাঠকের জীবনের চাহিদা, সময়—সবটাই আলাদা। কারও চটজলদি একটা সমাধান দরকার, কেউ হয়তো দীর্ঘ একটা পরিকল্পনা খোঁজে। বইটা দুই দিকই ঠাণ্ডা মাথায় ধরে রাখে।
আরেকটা দারুণ বিষয়, শুধু থিউরিতে আটকে থাকেনি। লেখক বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, নিখুঁত হতেই হবে—এমন বাজে মানসিকতা ছেড়ে দিতে। অনেকেই পারফেকশন ফাঁদে পড়ে কিছু শুরুই করতে পারে না। আবার বলেছেন—নিজের শরীরের ছন্দ চেনো, কারও সকাল ভালো, কারও রাত। সেই সময়টাই বেছে বড় কাজে গা ঢালো। অগ্রাধিকার ভেবে তাহলে মনোযোগও বাড়ে, কাজও এগোয়।
এখানে সময় ব্যবস্থাপনা মানে শুধু টুডু-লিস্ট মেনেজ করা না, কিংবা অ্যালার্মের ঘড়ি পিছিয়ে-পড়া নয়। “হেলথ টিপস” বোঝায় ভালো স্বাস্থ্য ছাড়া সময়ে বারাকাহ আসেই না। ঘুমটা ঠিক থাকা, খাওয়াদাওয়া ঠিকমতো করা—এসব আবার সময় ব্যবস্থার সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। “বারাকাহ টিপস” অংশে লেখক দেখান, কিভাবে নিয়ত ঠিক রেখে, অপ্রয়োজনে সময় নষ্ট না করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সময় দিন, তাহলে অল্প সময়েও বরকত আসে।
সব দিন ভালো যায় না, মন খারাপ থাকে, কাজ করার ইচ্ছা নেই—এই বইয়ের শেষ অংশ মানুষিক দুর্বল দিন নিয়ে খোলাখুলি কথা বলে। জীবনের বাস্তবতা হলো, সব সময় আপনি মোটিভেটেড থাকবেন না। লেখক সেটাই স্বীকার করেছেন। খারাপ দিনেও ছোট ছোট কাজের মধ্যে সময়টাকে কাজে লাগানোর পথ বাতলান তিনি। এখানেই বইটা সাধারণ প্রোডাক্টিভিটি বইয়ের চেয়ে আলাদা। জীবন অনেক টালমাটাল—বইটাও সে কথা অস্বীকার করে না।
তো, কেন পড়বেন এই বই? আধুনিক সময়ের অ্যাডভাইস, টিপস ও কোর্সের ভিড়ে বেশিরভাগ পরামর্শই আসে পাশ্চাত্য ধারণা থেকে—সময় মানে কাজ-টাকায় কাটতি। ইসমাইল কামদার বরং সময়কে ধরেন নিজের পরিচয়, আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব হিসেবে। পাশাপাশি বাস্তব প্রেক্ষাপটে—ডিজিটাল বিভ্রান্তি, মানসিক চাপ এসবও নজরে এনেছেন। যারা নিজের দৈনন্দিন জীবনে সময়ের কদর করতে চান, দ্বীন আর দুনিয়া মেলাতে চান, “সময়ে বারাকাহ” বুঝতে চান—তাদের জন্য এই বইটা খুব দরকারি। সহজ ভাষা, বাস্তব গল্প আর কাজের চিন্তা—সব মিলিয়ে কিন্ত এই বইটাতে শুধু জ্ঞান নয়, জীবনে লাগানোর মতো দিকনির্দেশনা মিলবে। বাংলায় আত্ম-উন্নয়নমূলক বই হিসেবে মুসলিম পাঠকদের জন্য “টাইম ম্যানেজমেন্ট” নিঃসন্দেহে একটা বড় সংযোজন।
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন