![]() |
| বজ্রকলম |
বজ্রকলম
লেখক : আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা
প্রকাশনী : মাকতাবাতুত তাকওয়া
বিষয় : ইতিহাস ও ঐতিহ্য
আরো পড়ুন-
বজ্রকলম: ইতিহাসের প্রচলিত ধারায় একটি ঝাঁকুনি
লেখক পরিচয়
আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা—উপমহাদেশের ইতিহাসচর্চার মাঠে তাঁর নাম ঝড় তোলে। ১৯৩৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার মেমারি শহরে তাঁর জন্ম, ২০২১ সালের ১৫ এপ্রিল জীবনাবসান। বক্তা, গবেষক, লেখক—এই ত্রিমাত্রিক পরিচয়ে তিনি দুই বাংলার পাঠকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন। মোর্তজা ইতিহাস বিশ্লেষণে থেমে থাকেননি। প্রচলিত বয়ানের আড়ালে কী আছে, সত্যিটা কোথায়—এই ভেতরের প্রশ্নটা নিয়েই তিনি লিখেছেন। আর, এই অন্তর্দৃষ্টি আর তীক্ষ্ণ প্রশ্নের জন্যই তিনি প্রশংসা আর বিতর্ক—দু’টোই সঙ্গী করে হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন।
তাঁর বইয়ের তালিকাটা ছোট নয়। *ইতিহাসের ইতিহাস*, *এ এক অন্য ইতিহাস* (একাধিক খণ্ড), *চেপে রাখা ইতিহাস*, *বাজেয়াপ্ত ইতিহাস*, আর এই আলোচ্য *বজ্রকলম*—সবই পাঠকবিশ্বে আলোড়ন তুলেছে। এর মধ্যে *বজ্রকলম*-কেই অনেকেই তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজ বলে মানেন।
বইটার পটভূমি আর মূল ভাব
*বজ্রকলম* আসলে মোর্তজার বড় ইতিহাস-সিরিজের এক টুকরো, যাতে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের গোটা প্রচলিত ইতিহাসবয়ান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে পাঠ্যবইয়ে মুসলিমদের নিয়ে লেখা তথ্যগুলো নিয়ে তাঁর সমস্যা ছিল। তাঁর দাবি, এগুলোর অনেকটাই ভিত্তিহীন, পক্ষপাতদুষ্ট। ব্রিটিশ শাসক কিংবা আধুনিক ভারতীয় ঐতিহাসিকরা মুসলিম শাসন ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে যেমনভাবে তুলে ধরেছেন, সেখানে ঘাটতি, পক্ষপাত আর বিকৃতির ছাপ স্পষ্ট। শান্তি নেই—তিনি সেই অস্বস্তিটা শব্দে ঢেলে দিয়েছেন।
এই কারণেই তিনি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্র, রাজা রামমোহন, গান্ধী, দেবেন্দ্রনাথ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীদের নিয়ে প্রচলিত বয়ানের বাইরে গিয়ে সমালোচনার ঝাঁপি খুলে বসেন। মাঝেমাঝে শোরগোলও উঠেছে—যেমন ১৯৮১ সালে তাঁর একটি বই পশ্চিমবঙ্গ সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল। সেটাই তাঁর কাজকে আরও চর্চিত করে তোলে, আর তিনি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক নতুন বই লিখে যান।
আলোচিত দিক
মোর্তজার লেখা পড়লে বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত ঘটনাগুলো নিয়ে থেমে থাকেননি। পলাশীর যুদ্ধ বা অন্ধকূপ হত্যার মতো ঘটনা, কিংবা আকবরের শাসনকাল—এগুলোকে তিনি নতুন আলোর নিচে আনতে চেয়েছেন। প্রমাণ হাজির করেছেন, যুক্তি সাজিয়েছেন—যেগুলো সাধারণ পাঠ্যপুস্তকে মুখে মুখে ঘুরে বেড়ায় না। তাঁর এই নতুন ব্যাখ্যা অনেক পাঠককে ভাবিয়েছে, কেউ বিশ্বাস করেছে, আবার কারও মনে দ্বিধাও উঁকি দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় কথা—উপমহাদেশে “বিদেশি” বলা কাদের ঠিক? অন্য এক বই *চেপে রাখা ইতিহাস*-এ যেমন প্রশ্ন ছিল, মুসলিমদের যদি বিদেশি বলি, তাইলে আর্যদের কী বলব? *বজ্রকলম*-এও সেটা ফিরে আসে। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসবয়ানের বাইরে এসে নিজের তথ্য-যুক্তিগুলো নিখুঁতভাবে সাজাতে চেয়েছেন তিনি।
বইয়ের কাঠামো আর ধারাবাহিকতা
*বজ্রকলম* মূলত বড় সিরিজের অংশ, এরপর আবার এরই ধারাবাহিকতায় *এ এক অন্য ইতিহাস* নামে বই বেরিয়েছে। মানে, এটা এককথায় একটা চলমান গবেষণার শুরু। প্রতিটি খণ্ডে তিনি আগের প্রশ্নের পিছু ছাড়েননি, বরং নতুন প্রমাণ, তথ্যের খোঁজ করেছেন।
পৃষ্ঠাসংখ্যা কম নয়, কয়েকশো পাতার বিশাল বই। হার্ডকভারে বেরোয়, নতুন সংস্করণও মাঝেমধ্যেই আসে। এতেই বোঝা যায়, বইটার জন্য পাঠকমহলে আগ্রহ এখনও বেশ চাঙা।
গ্রন্থের গ্রহণযোগ্যতা ও বিতর্ক
মোর্তজার বই নিয়ে বিতর্ক নেই—এটা বললে ভুল বলা হবে। তাঁর অনুসারীরা বলেন, মোর্তজা প্রচলিত ইতিহাসের সীমাবদ্ধতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। আবার প্রাতিষ্ঠানিক গবেষকেরা তাঁর সূত্র, ব্যাখ্যা আর সিদ্ধান্ত বুঝে নিতে চান। মোর্তজা ঘরানার ইতিহাস এলেও, তাঁর লেখা ঠিক “মেইনস্ট্রিম” ইতিহাসের পরীক্ষায় সবসময় পাশ দেয়নি। এই জায়গা থেকেই বিতর্কগুলো জন্ম নেয়। আর, তাঁর বই ১৯৮১ সালে বাজেয়াপ্ত হওয়াও বলে দেয়, লেখার মধ্যে কতটা ভিন্ন স্বর ছিল।
যা-ই হোক, এই বিতর্কও তাঁকে পাঠকদের কাছে আরও বড় করে তোলে। ইসলামি ইতিহাস-ভাবনায় আগ্রহীরা তাঁর বই আজও পড়েন।
উপসংহার
*বজ্রকলম* কেবল ইতিহাস নয়—এটা মূলত প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে বাড়তি কিছু ভাবার সুযোগ। পুরোনো ছকে সাজানো তথ্যের বাইরে, নতুন যুক্তি আর ব্যাখ্যা দিয়ে লেখক চেষ্টা করেছেন অন্যভাবে ইতিহাস দেখতে শেখাতে। ইতিহাস নিয়ে, বিশেষ করে এমন বিতর্কিত বই পড়ার সময়, চোখ-কান খোলা রাখা জরুরি। মোর্তজার ব্যাখ্যা শুনুন, অন্য দিকও দেখুন—তবেই তো সত্যটা ধরা পড়বে। যে ইতিহাস একসুতোয় গাঁথা—not always true।
একটা কথা দরকারি—*বজ্রকলম*-এ যেসব ইতিহাসের দাবির কথা বলা হয়েছে, সেসব নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে একমত নেই। তাই কৌতূহলী পাঠকরা তাঁর বইয়ের পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠিত উৎসও পড়ে নিলে দৃষ্টিটা আরও বড় হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন