![]() |
| সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ:) |
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ:)
লেখক : শাইখ আব্দুল্লাহ নাসিহ উলওয়ান (রহ.)
বিষয় : ইসলামি ইতিহাস
প্রকাশনী : সমর্পন
আরো পড়ুন-
সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ:): এক ন্যায়বান বিজেতার গল্প
ভূমিকা
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে মুসলিম শাসকদের অনেক নাম খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর নাম আলাদা করে চোখে পড়ে। ৫৭২ থেকে ৫৮৯ হিজরীর এই অল্প সময়েই তিনি অনেক কিছু বদলে দিয়েছেন। তার নাম শুনলেই বাইতুল মুকাদ্দাসের পতাকা ওড়া কিংবা হিত্তিনের যুদ্ধ-এসব দৃশ্য মনে আসে। শুধু যোদ্ধা হিসেবে তো নয়ই, সালাহউদ্দীন ছিলেন ন্যায়ের প্রতীক, উদার আর চরিত্রে এতটা মধুর যে, তার শত্রুরাও তাকে সম্মান করেছে।
জন্ম আর ছোটবেলা
৫৩২ হিজরী (১১৩৭-৩৮ খ্রিস্টাব্দ), ইরাকের তিকরিতের এক কুর্দি পরিবারে তার জন্ম। পুরো নাম ইউসুফ ইবনে আইয়ুব, আর সালাহউদ্দীন ছিল তার উপাধি—মানে ধর্মের কল্যাণ। বাবা নাজমুদ্দীন আইয়ুব আর চাচা আসাদুদ্দীন শিরকুহ দু’জনেই সে সময়ের রাজনীতি-দাপুটে মানুষ। ছোটবেলায় সালাহউদ্দীন ধর্মীয় পড়াশোনা, আরবি সাহিত্য আর ইসলামী জ্ঞানচর্চার মধ্যে বড় হন। দামেস্কে গিয়ে নুরুদ্দীন জঙ্গির রাজদরবারে রাজনীতি আর প্রশাসনের পাঠ নেন।
মিশরে উত্থান
সে সময় তার জীবনে বড় ধাক্কা আসে শিরকুহর মিশর অভিযানের সময়। সালাহউদ্দীন চাচার সঙ্গে যান, পরে চাচা মারা গেলে ৫৬৪ হিজরীতে (১১৬৯ খ্রিঃ) তিনি মিশরের উজির হন। আস্তে আস্তে দুর্বল ফাতেমী খিলাফতের ক্ষমতা নিজের হাতে আনেন এবং ৫৬৭ হিজরীতে (১১৭১ খ্রিঃ) আনুষ্ঠানিকভাবে ফাতেমী শাসন শেষ করেন। মিশর আব্বাসীয় খিলাফতের অধীনে চলে আসে, আর শিয়া ফাতেমী রাজত্ব শেষ হয়ে সুন্নি ইসলাম আবার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই পদক্ষেপে পুরো মিশর-সিরিয়া অঞ্চলে এক নতুন সময় ও শক্তি তৈরি হয়।
আইয়ুবী সাম্রাজ্যের শুরু
নুরুদ্দীন জঙ্গি মারা গেলে (৫৬৯ হিজরী/১১৭৪ খ্রি.) সালাহউদ্দীনের হাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বড় দায়িত্ব এসে পড়ে। তখনই আসল সালতানাতের শুরু। সিরিয়া, উত্তর ইরাক, হেজাজ, ইয়েমেন—একটির পর একটি এলাকা তার নিয়ন্ত্রণে আসে। কায়রো ও দামেস্ক এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, আর তিনি শুধুই বিজয়ের জন্য যুদ্ধ করেননি। প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি—সবকিছু ঢেলে সাজাতে কাজ করেন। কায়রোয় মাদ্রাসা গড়েন, সুন্নি শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন।
হিত্তিনের যুদ্ধ ও বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার
কোনো সন্দেহ নেই, সালাহউদ্দীনের জীবনের সবচেয়ে হইচই করা অধ্যায় হলো ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াই। শত বছর ধরে বাইতুল মুকাদ্দাস ও আশপাশের এলাকা তাদের দখলে ছিল। সালাহউদ্দীন বারবার মুসলিম শক্তিকে একসঙ্গে টানার চেষ্টা করেছেন, আর এটা তার কৌশলের বড় প্রমাণ। অবশেষে ৫৮৩ হিজরী (১১৮৭ খ্রি.) হিত্তিনের যুদ্ধে দুর্দান্ত জয় পান। সেই যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পুরো বাহিনী প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়, রাজা গাই দ্য লুসিনিয়ানসহ অনেকেই ধরা পড়েন।
এই বিজয়ের পরপরই সালাহউদ্দীন বাইতুল মুকাদ্দাস দখলে নেন—প্রায় ৮৮ বছরের পর এই পবিত্র শহর মুসলিমদের হাতে ফেরে। অথচ শহর নেওয়ার পর তার আচরণ ছিল এক কথায় অসাধারণ। যেখানে ক্রুসেডাররা প্রথমবার ঢোকার সময় হিংস্র ছিল, সালাহউদ্দীন বরং নিরাপত্তা দেন, দরকার হলে মুক্তিপণ নিয়েছেন, অনেককে একেবারে ছেড়েও দিয়েছেন। এ জন্য মুসলিম-অমুসলিম সবাই তার প্রশংসা করেছে।
তৃতীয় ক্রুসেড আর রিচার্ড দ্য লায়নহার্ট
বাইতুল মুকাদ্দাস ফেরত পাওয়ার খবর ইউরোপে গিয়ে হইচই ফেলে দেয়। ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড, ফ্রান্সের ফিলিপ আর জার্মানির ফ্রেডরিক বিশাল বাহিনী নিয়ে আসেন। সালাহউদ্দীন আর রিচার্ডের মধ্যে আক্রা, আরসুফ এসব জায়গায় যুদ্ধ চলে—কিন্তু মাঝখানে তাদের মধ্যে পারস্পরিক এক ধরনের সম্মানবোধও তৈরি হয়। শেষে ৫৮৮ হিজরী (১১৯২ খ্রি.) এক চুক্তিতে শহর মুসলিমদের হয়েই থাকে, আর খ্রিস্টানদের জন্য তীর্থ দর্শনের পথ খোলা থাকে।
চরিত্র ও ব্যক্তিত্ব
ন্যায়, ধৈর্য, উদারতা—এতটাই স্পষ্ট ছিলো সালাহউদ্দীনের মধ্যে, যে কেউ সেটা না মেনে পারে না। জীবনযাপন ছিল সহজ, মৃত্যুর সময় ব্যক্তিগত সম্পদও ছিল নগন্য—এমনকি দাফন খরচও ঠিকমতো হয়নি, ইতিহাসে তাই লেখা আছে। পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন, বিচারেও ন্যায় পালনে একচুলও ছাড় দিতেন না। এমনকি শত্রুর প্রতিও অহেতুক কঠোর ছিলেন না। এইসব কারণে ইউরোপের অনেক ইতিহাসবিদও তাঁকে আদর্শ চরিত্র হিসেবে বলেন, আর পাশ্চাত্য সাহিত্যেও তিনি সম্মান পান।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
৫৮৯ হিজরীর সফর মাস, মানে ১১৯৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ, দামেস্কেই শেষ শ্বাস ফেলেন সালাহউদ্দীন আইয়ুবী। কেবল সওদার বছর—মাত্র সতেরো—তার মধ্যে যা গড়েছেন সেটা বিরল। তার মৃত্যুর পর আইয়ুবী সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে যায়, তবে প্রশাসনিক কাঠামো, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—এসবের প্রভাব থেকে যায় বহুদিন। তার রাজত্ব যাওয়ার পর মিশরে মামলুকরা আসে, যারা পরে মঙ্গোল আগ্রাসন রুখতে বড় ভূমিকা রাখে।
উপসংহার
সলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী (রহ:) শুধু যুদ্ধজয়ী শাসক ছিলেন না, এক আদর্শ রোল মডেল হয়ে ছিলেন—কে কিভাবে শক্তি, ক্ষমতার সঙ্গে ন্যায়বিচার আর মানবতাকে মিলিয়ে নেয়। বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার ইতিহাসে তাকে অমর করেছে ঠিকই, আসলে তার মর্যাদা বেড়েছে যে সময় বিজয় করেও তিনি ক্ষমা, উদারতের পথে ছিলেন, সেটার জন্য। আজো মুসলিমরা তাঁর সাহস, ন্যায়কবিচার আর নেতৃত্বকে মনে রাখে—বলে, এমন মানুষ-ই তো হত আসলে নেতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন