উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান - মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ: | ummahor proti oikker ahoban

উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান
উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান

উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান
লেখক : মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ:
প্রকাশনী : উমেদ প্রকাশ
বিষয় : ইসলামি গবেষণা, সমালোচনা ও প্রবন্ধ

আরো পড়ুন-

উম্মাহর প্রতি ঐক্যের আহ্বান

ভূমিকা  
ইসলামের ভিতটা দাঁড়িয়ে আছে ঐক্যের ওপর—এই একটা মূল জায়গা, যেখান থেকে মুসলিম উম্মাহর শক্তি, সম্মান আর আসল পরিচয় জন্ম নেয়। কুরআনে আল্লাহ আমাদের বারবার সতর্ক করে দিয়েছেন, যেন আমরা নিজেদের মধ্যে বিভেদ না করি, ঝগড়ায় না জড়াই। আলোচ্য সময়ে একবার চারপাশে তাকালে একটাই জিনিস চোখে পড়ে: মুসলিম বিশ্ব আজ নানা সংকট, নানা ভাগাভাগি আর কলহে জর্জরিত। তাই এই মুহূর্তে ঐক্যের গুরুত্ব বুঝতে না পারলে বড় ভুল হবে।

কুরআনের আলোকে ঐক্যের গুরুত্ব  
আল্লাহ সুরা আলে ইমরানে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন: “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশি শক্তভাবে ধরে থাকো, আর আলাদা আলাদা হয়ো না।” ‘আল্লাহর রশি’ মানে এখানে বোঝানো হয়েছে—কুরআন আর সুন্নাহ—এই দুইয়ের ওপর সবাই যখন মিলে থাকে, তখনই আসল ঐক্য গড়ে ওঠে। এই আয়াতের পরে আল্লাহ আমাদের আবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, জাহিলিয়াতের যুগে মানুষ কীভাবে একে অপরের শত্রু ছিল, আর ইসলাম এসে সবাইকে ভাই বানিয়ে দিয়েছে।

আরও কিছু জায়গায় আল্লাহ বলেছেন, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করলে তোমরা দুর্বল হয়ে পড়বে; মুমিনদের শক্তি নষ্ট হয়ে যাবে, মর্যাদা হারাবে। সোজা কথায়, ঐক্য শুধু কোন সামাজিক ব্যাপার না—ইসলামের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই শিক্ষা আমাদের মর্যাদার সাথেই সরাসরি জড়িত।

হাদিসের শিক্ষা  
প্রিয় নবী (সা.) মুমিনদের সম্পর্ককে তুলনা করেছেন একটা দেহের সঙ্গে। দেহের এক জায়গায় চোট লাগলে, পুরো শরীর কষ্ট পায়—ঘুম হারাম হয়ে যায়, জ্বর আসে। খুব সহজ ভাষায় তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, মুসলিম উম্মাহ আসলে একটি দেহ, একটা আত্মা। এখানে একজনের যন্ত্রণায়, কষ্টে, সবাই যেন কেঁদে ওঠে।

আরও বোঝান, দয়া, ভালোবাসা আর সহানুভূতি—এই তিনটা জিনিস মুমিনদের মধ্যে ঠিক ওই দেহের মতো কাজ করে। একটি অংশ আঘাত পেলে, পুরো শরীর সাড়া দেয়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই বার্তাটাই সবচেয়ে জরুরি। আজ সামান্য তর্ক-বিতর্ক, মতভেদ নিয়ে মুসলিমরা দূরে সরে যাচ্ছে। অথচ, এই শিক্ষা—একজনের দুঃখ মানে সবার দুঃখ।

বর্তমান বিভক্তির কারণসমূহ  
আজকের মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের এই মহাপাঠ একরকম ভুলে থাকা হচ্ছে। কেন এমন হলো? কারণ খুঁজলে কয়েকটা বড়ো বিষয় বের হয়ে আসে—

প্রথমত, মাযহাব আর দল নিয়ে সংকীর্ণ ভাবনা। ইসলামে ফিকহি মতভেদ সবসময় ছিল—এটা স্বাভাবিক, এতে কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু আজ এই মতভেদ নিয়ে একে অপরকে ভুল বলা, কখনও কাফের পর্যন্ত বলে ফেলা হচ্ছে—এটাই বিভেদের বড় কারণ।

দ্বিতীয়ত, রাজনীতির স্বার্থ আর বাইরে থেকে আসা কূটকৌশল। বহু বিদেশি শক্তি নিজেদের সুবিধার জন্য মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে ফাটল ধরায়। আজও এই বিভাজনের জন্য বড় দায়ী এটাই।

তৃতীয় কারণ—নিজস্ব স্বার্থ আর নেতৃত্বের লোভ। ধর্মীয় সংগঠন কিংবা সামাজিক আন্দোলনে নেতৃত্ব কে নেবে, এই নিয়ে ঝগড়া; তাতেই মূল উদ্দেশ্য ফাঁকা হয়ে যায়।

চতুর্থ কারণ হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখানে ভুল তথ্য, গুজব বা মর্যাদা-হানি করা মন্তব্য নিমিষে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস বেড়ে যায় কিছুতেই।

ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথ  
এত কিছুর পরও, উম্মাহর ঐক্য ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। কিছু জায়গায় জোর দিতে হবে।

প্রথমত, যেইসব বিষয়ে সবার ঐক্য দরকার, সেগুলোতে অটল থাকা, কিন্তু ছোটখাটো খুঁটিনাটি বিষয়ে সহনশীল হওয়া—এটাই রাস্তা। যেমন, আকিদা আর ইবাদতের মৌলিক জায়গায় তো সবাই এক। ফিকহি ভিন্নমত থাকতেই পারে—এটা জ্ঞান ও বিচিত্রতার সৌন্দর্য, বৈরিতা না।

দ্বিতীয়ত, উত্তম আচরণ আর ভদ্রতা চর্চা করা। যাদের মত ভিন্ন, তাদের অপমান নয়, বরং শালীন ভাষায় কথা বলা—এটাই ইসলামী আদব।

তৃতীয়ত, যেখানে উম্মাহর স্বার্থ, সেই কাজ একসাথে করা—শিক্ষা, দাওয়াহ, মানবিক সহায়তা বা সমাজসেবার মতো কাজে পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সবাই হাত লাগালে দূরত্ব কমবে, আস্থা বাড়বে।

চতুর্থত, ওলামায়ে কেরামের বড় দায়িত্ব আছে এখানে। তারা যদি বিভেদ বাড়ানোর বদলে ঐক্যের বার্তা ছড়ান—পরিবর্তন তখনই আসতে শুরু করবে। এদের কথায় সমাজ চলে।

পঞ্চমত, ঐক্যের শিক্ষাটা ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। পরিবার, প্রতিবেশী, মসজিদে—যেখানে ভিন্নমতের মানুষকেও সম্মান করা শেখানো হবে, সেখানেই সত্যিকারের ঐক্যের বীজ গজাবে।

উপসংহার  
মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস বলছে—ঐক্য থাকলে আমরা ছিলাম সেরা, বিজ্ঞান, সভ্যতা, নৈতিকতার চূড়ায়। ভাগাভাগি শুরু হলে দুর্ভাগ্য আর লাঞ্ছনাই এসেছে। আজকের ঐসব ভয়ানক চ্যালেঞ্জের সময়ে, একটাই সমাধান—সব মান-অভিমান ভুলে গিয়ে কুরআন আর সুন্নাহর কাছে ফেরা, পারস্পরিক ভালোবাসা আর ঐক্যকে প্রথম স্থানে রাখা।  

আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দিন, যাতে আমরা তুচ্ছ মতভেদ কাটিয়ে উঠে উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে একজোট হতে পারি। সবাই মিলেই যেন শক্তিশালী, মর্যাদাশীল একটি মুসলিম উম্মাহ গড়ে তুলতে পারি—এই আকাঙ্ক্ষা নিয়েই শেষ করি। আমিন।

Post a Comment

أحدث أقدم