![]() |
| রিযিক আল্লাহর হাতে |
রিযিক আল্লাহর হাতে
লেখক : জাহেদুল আহসান তারেক
প্রকাশনী : আহসান পাবলিকেশন
বিষয় : ঈমান ও আকীদা
আরো পড়ুন-
রিযিক আল্লাহর হাতে
ভূমিকা
রিযিক—মানুষের জীবনের এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে কমবেশি সবাই চিন্তিত। খাবার-দাবার, পোশাক, বাসস্থান, পড়াশোনা, পরিবারের ভবিষ্যৎ কিংবা নিজের কর্মজীবন—জীবনের নানা প্রয়োজন ঘিরেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, “আগামীকাল কী হবে?”
এই দুশ্চিন্তার মাঝেই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হলো একটি দৃঢ় বিশ্বাস—রিযিক আল্লাহর হাতে।
আল্লাহ তায়ালাই প্রকৃত রিযিকদাতা। পৃথিবীর প্রতিটি জীবের জন্য তিনি রিযিকের ব্যবস্থা করেছেন। মানুষকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু সেই চেষ্টার ফল কী হবে, কতটুকু হবে এবং কখন আসবে—সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে।
এই বিশ্বাস হৃদয়ে গেঁথে গেলে রিযিক নিয়ে অস্থিরতা অনেকটাই কমে আসে। মানুষ হারাম পথে ছুটে যাওয়ার পরিবর্তে হালাল উপায়ে চেষ্টা করার সাহস পায় এবং নিজের ভবিষ্যৎ আল্লাহর ওপর ভরসা করে ছেড়ে দিতে শেখে।
আল্লাহই প্রকৃত রিযিকদাতা
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, প্রকৃত রিযিকদাতা তিনিই। সূরা হূদের ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে বিচরণকারী এমন কোনো প্রাণী নেই যার রিযিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।
একবার ভাবুন—মানুষের মতো অসংখ্য প্রাণী, পাখি, পোকামাকড় কিংবা সমুদ্রের গভীরে থাকা অগণিত জীব। তাদের প্রত্যেকের জীবনধারণের জন্য আল্লাহ কোনো না কোনো ব্যবস্থা রেখেছেন।
সূরা যারিয়াতেও আল্লাহ তায়ালা মানুষের রিযিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছেন। এতে মুমিনের জন্য একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়—রিযিকের প্রকৃত মালিক মানুষ নয়, আল্লাহ।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ কোনো চেষ্টা করবে না। বরং মানুষের দায়িত্ব হলো বৈধ পথে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা। কাজ করবে, ব্যবসা করবে, পড়াশোনা করবে, দক্ষতা অর্জন করবে; কিন্তু নিজের রিযিকের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে মনে করবে না। চেষ্টা আমাদের দায়িত্ব, ফলাফল আল্লাহর সিদ্ধান্ত।
রিযিক কি আগে থেকেই নির্ধারিত?
ইসলামী আকীদা অনুযায়ী, মানুষের তাকদীরের বিভিন্ন বিষয় আল্লাহর জ্ঞানে ও নির্ধারণে রয়েছে। হাদীসে মানুষের রিযিক, আয়ু, আমল এবং তার পরিণতি সম্পর্কে ফেরেশতার লিখে দেওয়ার কথা এসেছে।
এই বিশ্বাসের একটি বড় শিক্ষা হলো—অন্যের রিযিক দেখে অস্থির হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারও হাতে বেশি সম্পদ এসেছে বলে তার প্রতি হিংসা করার দরকার নেই। আবার নিজের জীবনে কোনো সময় রিযিকের সংকট দেখা দিলে হতাশ হয়ে পড়ারও কারণ নেই।
আল্লাহ প্রত্যেকের জন্য যে ব্যবস্থা রেখেছেন, তা তাঁর জ্ঞান ও হিকমতের অধীন।
তবে তাকদীরে বিশ্বাসের অর্থ কখনোই অলস হয়ে বসে থাকা নয়। ইসলাম মানুষকে চেষ্টা করতে শেখায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ ব্যবসা করেছেন, সাহাবায়ে কেরামও ব্যবসা, কৃষিকাজসহ বিভিন্ন বৈধ পেশায় যুক্ত ছিলেন।
অর্থাৎ তাকদীরে বিশ্বাস আর পরিশ্রম—দুটো পরস্পরের বিরোধী নয়। বরং একজন মুমিন চেষ্টা করবে এবং একই সঙ্গে বিশ্বাস রাখবে যে, তার চেষ্টার ফল আল্লাহর ইচ্ছাতেই আসবে।
তাওয়াক্কুল: চেষ্টা করে আল্লাহর ওপর ভরসা
রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্যতম বড় সমাধান হলো তাওয়াক্কুল। তাওয়াক্কুল মানে বসে থাকা নয়; বরং নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করার পর ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি হাদীসে পাখির উদাহরণ দিয়েছেন। পাখিরা সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় বাসা থেকে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসে পেট ভরা অবস্থায়।
পাখিরা কিন্তু বাসায় বসে থেকে রিযিকের অপেক্ষা করে না। তারা বের হয়, খাবারের সন্ধান করে, চেষ্টা করে। আর আল্লাহ তাদের জন্য রিযিকের ব্যবস্থা করেন।
মুমিনের জীবনেও এই ভারসাম্য থাকা দরকার। নিজের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে নয়, বরং দায়িত্ব পালন করেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করতে হবে।
হাত থাকবে কাজে, আর হৃদয় থাকবে আল্লাহর ওপর ভরসায়।
রিযিকের চিন্তা নয়, আল্লাহর ওপর বিশ্বাস
আজকের জীবনে রিযিকের দুশ্চিন্তা খুব সহজেই মানুষকে অস্থির করে দিতে পারে। ব্যবসায় লোকসান, চাকরির অনিশ্চয়তা, পরিবারের খরচ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এসব বাস্তব সমস্যা।
কিন্তু একজন মুমিন এসব সমস্যার মাঝেও মনে রাখে, রিযিকের দরজা মানুষের হাতে নয়।
আল্লাহ যাকে চান তার রিযিক প্রশস্ত করেন এবং যাকে চান সীমিত করেন। এর পেছনে তাঁর হিকমত রয়েছে। তাই কারও রিযিক বেশি হওয়া মানেই আল্লাহ তার ওপর বেশি সন্তুষ্ট—এমন নয়। আবার কারও রিযিক কম হওয়াও আল্লাহর অসন্তুষ্টির প্রমাণ নয়।
দুনিয়ার সম্পদ অনেক সময় পরীক্ষা। কারও পরীক্ষা হয় অভাব দিয়ে, কারও পরীক্ষা হয় প্রাচুর্য দিয়ে। একজনের জন্য ধৈর্য পরীক্ষা, অন্যজনের জন্য কৃতজ্ঞতা পরীক্ষা।
তাই রিযিক কম হলে ধৈর্য ধরতে হবে, আর বেশি হলে কৃতজ্ঞ হতে হবে। উভয় অবস্থাতেই আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখাই আসল বিষয়।
রিযিকের জন্য হারাম পথে নয়
রিযিক আল্লাহর হাতে—এই বিশ্বাস মানুষের চরিত্রে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
যে ব্যক্তি সত্যিই বিশ্বাস করে তার রিযিক আল্লাহ নির্ধারণ করেন, সে রিযিকের জন্য ঘুষ, সুদ, প্রতারণা, মিথ্যা, ওজনে কম দেওয়া কিংবা অন্য কোনো হারাম পথ বেছে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবে।
হারাম পথে অর্জিত অর্থ হয়তো বাহ্যিকভাবে লাভ মনে হতে পারে, কিন্তু একজন মুমিনের কাছে শুধু টাকার পরিমাণই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরকতও গুরুত্বপূর্ণ।
হালাল উপার্জন হয়তো কখনো অল্প মনে হতে পারে, কিন্তু তাতে প্রশান্তি ও বরকত থাকতে পারে। অন্যদিকে হারাম উপার্জন সাময়িকভাবে বেশি মনে হলেও তা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাত—দুই দিকেই ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই রিযিকের ব্যাপারে সঠিক নীতি হওয়া উচিত—চেষ্টা করব, কিন্তু হারাম পথে নয়; উপার্জন করব, কিন্তু আল্লাহর অবাধ্য হয়ে নয়।
রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তা হলে কী করবেন?
রিযিক নিয়ে দুশ্চিন্তা আসতেই পারে। মানুষ হিসেবে উদ্বিগ্ন হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই দুশ্চিন্তাকে নিজের ঈমান ও মানসিক শান্তির ওপর কর্তৃত্ব করতে দেওয়া ঠিক নয়।
বরং কয়েকটি বিষয় মনে রাখা দরকার—
- নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিশ্রম করতে হবে।
- উপার্জনের ক্ষেত্রে হালাল ও বৈধ পথ বেছে নিতে হবে।
- অন্যের রিযিক দেখে হিংসা করা যাবে না।
- বিপদের সময় ধৈর্য ধরতে হবে।
- আল্লাহর নেয়ামত পেলে কৃতজ্ঞ হতে হবে।
- দোয়া করতে হবে এবং আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখতে হবে।
- মনে রাখতে হবে, মানুষের পরিকল্পনার চেয়েও আল্লাহর পরিকল্পনা অধিক জ্ঞানপূর্ণ।
রিযিকের দরজা কখন খুলবে, কোথা থেকে আসবে কিংবা কোন পথে আসবে—তা আমরা জানি না। তাই বর্তমান পরিস্থিতি দেখে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চূড়ান্ত হতাশ হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই।
শেষ কথা
রিযিক আল্লাহর হাতে—এই বিশ্বাস শুধু একটি কথা নয়; এটি একজন মুমিনের জীবনদৃষ্টির অংশ।
এই বিশ্বাস মানুষকে অলস করে না। বরং হালাল পথে আরও দৃঢ়ভাবে চেষ্টা করতে শেখায়। একই সঙ্গে ব্যর্থতা এলে হতাশ না হয়ে আবার দাঁড়ানোর শক্তি দেয় এবং সাফল্য এলে অহংকার থেকে রক্ষা করে।
তাই রিযিকের জন্য চেষ্টা করুন, নিজের দায়িত্ব পালন করুন, দক্ষতা বাড়ান, হালাল পথ আঁকড়ে ধরুন। কিন্তু নিজের হৃদয়কে দুশ্চিন্তার হাতে তুলে দেবেন না।
মনে রাখুন—আপনার কাজ চেষ্টা করা। রিযিক পৌঁছে দেওয়ার মালিক আল্লাহ।
হালাল পথে চেষ্টা করুন, দোয়া করুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। যে হৃদয় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করতে শেখে, সেই হৃদয় অভাবের মাঝেও আশা খুঁজে পায় এবং প্রাচুর্যের মাঝেও নিজের রবকে ভুলে যায় না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন