কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল ও মৃত্যুহীন জীবন - এস. এম. জাকির হুসাইন | koranic self control abong mrittuhin jibon

কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল ও মৃত্যুহীন জীবন

কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল ও মৃত্যুহীন জীবন
লেখক : এস. এম. জাকির হুসাইন
প্রকাশনী : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী
বিষয় : কুরআন বিষয়ক আলোচনা

আরো পরুন-

কোরআনিক আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মৃত্যুহীন জীবন
মানুষের সবচেয়ে বড় যুদ্ধটা বাইরে নয়, বরং নিজের ভিতরে, নিজের প্রবৃত্তির সঙ্গে। কোরআনে এই অন্তর্দ্বন্দ্বকে চরম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এটা আসলেই সফলতার মাপকাঠি। আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সেলফ কন্ট্রোল ইসলামী দর্শনের কেন্দ্রে, আর এর সঙ্গেই সরাসরি জড়িয়ে আছে মৃত্যুহীন, মানে অনন্ত জীবন।

কোরআনের ভাষায় আত্মনিয়ন্ত্রণ
কোরআনে নফস নিয়ে বারবার কথা বলা হয়েছে। নফস—মানে মানুষের প্রবৃত্তি—এই জিনিসটা তিনভাবে আসে। একটা আম্মারা, যা খারাপের দিকে টানে; একটা লাওয়ামা, মানে নিজের ভুল বুঝতে পারা; আর একটা মুতমাইন্না—যেটা শান্ত ও আশ্বস্ত। একজন মুমিনের লক্ষ্য, ধাপে ধাপে নিজের প্রবৃত্তিকে সুস্থির ও প্রশান্ত করা। সূরা আশ-শামসে আল্লাহ একেবারে সোজাসাপ্টা বলেছেন, যে নিজের নফস পরিশুদ্ধ করে সে-ই সত্যিকারের সফল, আর যে নিজেদের নফসকে কলুষিত রাখে, সে-ই ব্যর্থ।

আত্মনিয়ন্ত্রণ বা সংযম শুধু খাওয়া-দাওয়া কিংবা যৌনতা নিয়ে নয়। এটা আসলে রাগ, লোভ, অহংকার, ঈর্ষা—এসব সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ। এমনকি জিভকে সামলানোও এর অংশ। তাকওয়ার মানে, নিজেকে খারাপ প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করা। রোজার কথাও এসেছে—रোজা মানে শুধু উপোস থাকা নয়, রোজার জন্য বৈধ জিনিসও সাময়িকভাবে ছেড়ে থাকা শেখা। এতে মানুষ নিজের ইচ্ছাশক্তি চর্চা করে।

নামাজ ও ধৈর্য—আত্মনিয়ন্ত্রণের চর্চা
কোরআনে নামাজকে বলা হয়েছে, এটা মানুষকে অশ্লীল ও খারাপ কাজ থেকে আটকে রাখে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট নিয়মে নিজের মনকে গুছিয়ে আনা। এতে সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, আত্মসংযম—সবই আসে। আর ধৈর্য, মানে সবর—বিপদে, মন্দ সময়ে, রাগ বা লোভের ভিতর—সব জায়গায় কোরআন এটা চেয়েছে। রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটা মূল শক্তি—শুধু শারীরিক শক্তি নয়, মনোশক্তি।

মৃত্যুহীন জীবনের কথা
কোরআনে মৃত্যু মানে শেষ নয়, বরং এটা আরেক জীবনে যাওয়ার সিঁড়ি। দুনিয়ার জীবন আসলে পরীক্ষা, আর ফলাফলটা মিলবে আখিরাতে—পরকালেই আসল চিরস্থায়ী জীবন। একে-ই বলে মৃত্যুহীন জীবন, যেখানে আত্মার অস্তিত্ব থেকে যায়, শেষ হয় না। কোরআনে স্পষ্ট, মরবে সবাই, কিন্তু আত্মা মরে না—এটা শুধু নতুন ধাপের শুরু।

নিজের প্রবৃত্তির ওপর যে নিয়ন্ত্রন আনতে পারে, সে-ই পরকালের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। দুনিয়ার আকর্ষণ আর চাকচিক্য সামলাতে পারে যার মনের জোর আছে, কোরআনের দৃষ্টিতে সেতো ফুটন্ত মানসিকতা। কারণ সে ঠিকঠাক জানে, এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী—মুল পুরস্কার আখিরাতেই।

আত্মনিয়ন্ত্রণ না থাকলে কী ঘটে
কোরআনে অনেক জাতির কথা আছে—এরা নিজেদের প্রবৃত্তি মেনে নষ্ট হয়ে গেছে। ফিরাউন, কারুন, কিংবা নানা জাতির লাগামছাড়া জীবন—সব উদাহরণ। নিজের নফসকে ছেড়ে দিলে ঠিক এটাই হয়: শুধু নিজে নয়, গোটা সমাজ ভুগতে থাকে। অন্যদিকে, ইউসুফ (আঃ)-এর মতো, যারা প্রলোভনের সামনে দাঁত ফোটায়নি, তাদের উদাহরণ দিয়ে কোরআন দেখিয়ে দিয়েছে আত্মসংযম আসলে কোথায় নিয়ে পৌঁছাতে পারে।

ব্যবহারিক জীবনে এর মানে
আজকের যুগে আত্মনিয়ন্ত্রণের চাহিদা আরও বেড়েছে। প্রযুক্তি সবকিছু হাতের মুঠোয়, চাইলেই ভোগ—কিন্তু ধৈর্যের জায়গা কমে আসছে। এই পরিস্থিতিতে কোরআনের শিক্ষা—নিয়মিত ইবাদত, আত্মপরিকল্পনা, কৃতজ্ঞতা, আর পরকালের স্মরণ—মানুষকে ভারসাম্য শেখায়। প্রতিদিন নিজের কাজ কেমন হলো একটু ভেবে দেখা, ভুল স্বীকার আর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া—এসব ধাপে ধাপে মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী করে তোলে।

শেষ কথা
কোরআনের দৃষ্টিতে আত্মনিয়ন্ত্রণ আলাদা কোনো নৈতিক দিক নয়—এটা আখিরাতের প্রস্তুতি। রাস্তা সহজ নয়, কিন্তু সত্যিকারের সফলতা এখানেই। এস. এম. জাকির হুসাইনের "কোরানিক সেলফ কন্ট্রোল ও মৃত্যুহীন জীবন" বইটা এসব নিয়ে গভীরভাবে ভাবার সুযোগ দেয়—পাঠকদের আত্মিক উন্নয়নে চমৎকার একটা দিশা দেখায়।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন