![]() |
| সভ্যতা-সংকট দিগ-দর্শন |
সভ্যতা-সংকট দিগ-দর্শন
লেখক : ড. আহমদ আবদুল কাদের
প্রকাশনী : বিশ্বকল্যাণ পাবলিকেশন্স
বিষয় : ইসলামি বিবিধ বই
আরো পরুন-
সভ্যতা-সংকট ও দিশার সন্ধান
ভূমিকা
আজ মানুষ চেনা-অচেনা এক সংকটে আছে। বিজ্ঞানের উন্নতি সত্যি অবাক করার মতো, জীবন অনেক সহজও হয়েছে... কিন্তু মানুষ? সে এখনও ভেতরে ভেতরে ফাঁকা, দুশ্চিন্তায়, কখনো কখনো উদ্দেশ্যহীন। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কত-না উন্নতি! অথচ ভেতরের এই শূন্যতা দিন দিন বেড়েই যায়। আধুনিক সভ্যতার এই বিপর্যয়টা ঠিক এখানেই: বাহ্যিক সাফল্য আর অভ্যন্তরীণ সংকট। ড. আহমদ আবদুল কাদের তাঁর "সভ্যতা-সংকট দিগ-দর্শন" বইতে এই সংকট খুঁটিয়ে দেখিয়েছেন—এবং ইসলামের দৃষ্টিতে এক ধরনের সমাধানের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
সংকটের প্রকৃতি
এই সংকট শুধু অর্থনীতির, রাজনীতির বা বিশ্বের সাধারণ গোলমালের কারণে নয়। খুব গভীরে গেলে দেখা যায়—এটা দার্শনিক আর আধ্যাত্মিক সংকট। মানুষ নিজের সবচেয়ে প্রাথমিক প্রশ্নগুলোর সামনে দাঁড়াতে ভুলে গেছে। কে আমি? কেন এসেছি? আমি কী চাই? অথচ আমাদের চারপাশটা শুধু প্রতিযোগিতা, ভোগ আর বাহ্যিক সফলতার গল্পে ভরা। পারিবারিক বন্ধন আলগা, সামাজিক সম্পর্ক কেমন যেন ঠুনকো, মানসিক রোগ-উদ্বেগের আবার কী অভাব! পরিবেশও আমরা ধ্বংস করছি। এসবই আসলে ওই ভেতরের শূন্যতারই আলাদা আলাদা প্রকাশ। পাশ্চাত্য সভ্যতা যেভাবে গড়ে উঠেছে, সেখানে মানুষকে কেবল অর্থনৈতিক জীব, ভোগ্য বস্তু হিসেবেই দেখা—আধ্যাত্মিক অনুভূতি বা স্বত্তা যেন গরহাজির। সেই জন্য, অজস্র সুযোগ-সুবিধা থেকেও বেশিরভাগ মানুষ নিজের কাছেই গরীব থেকে যাচ্ছে।
জ্ঞানতাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব
আর একটা বড় দ্বন্দ্ব, জ্ঞান কোথা থেকে আসে বা কীভাবে আমরা জানার চেষ্টা করি তা নিয়ে। পাশ্চাত্য দর্শন বলে: যা আমি অনুভব করি, দেখি—that’s it; মনে ‘প্রত্যাদেশ’ বা ওহির কথার এখানে কোনো দাম নেই। এই মনোভাব থেকে নৈতিকতাও আপেক্ষিক হয়ে পড়ে—ভালো-মন্দ কারও জন্য স্থায়ী থাকে না, যা যার সুবিধা তাই। তাই সমাজে, যুগে যুগে কে কেমন নৈতিকতা নেবে তা বদলায়। মোট কথা, আজকের নৈতিক বিশৃঙ্খলার মূলেই আছে এই আপেক্ষিকতা।
ইসলামের কথা আলাদা—জ্ঞান মানে শুধু ইন্দ্রিয় নয়; সাথে থাকতে হবে ওহি, কিংবা ঈশ্বর-প্রদত্ত নির্দেশনা। এই দুইয়ের সমন্বয়ের উপরই দাঁড়িয়ে থাকে ভারসাম্যপূর্ণ ও গভীর জীবনবোধ, যেখানে কেবল বৈষয়িক নয়, মানসিক আর আধ্যাত্মিক দিক থেকেও দিশা মেলে।
ইসলামি দিগ-দর্শন
‘দিগ-দর্শন’ মানেই তো দিক দেখানো, পথ খুঁজে দেয়া। ইসলামে এই সংকট মোকাবিলার আসল কথা—তাওহিদ বা একত্ববাদ। জীবনটা ঠিক তখনই গুছিয়ে চলে, যখন আল্লাহকে কেন্দ্র করে ব্যক্তি, সমাজ, পরিবার, রাজনীতি—সব দিক সুসংহত হয়। তখনই একটা অর্থপূর্ণ, সংগঠিত জীবনের স্বাদ পাওয়া যায়।
ইসলামে মানুষ কেবল মাটির জীব নয়—সে হল প্রতিনিয়িত দায়িত্বশীল, ন্যায়বিচার রক্ষার ‘খলিফা’। ভোগের বাইরে গিয়ে অর্থপূর্ণ কাজ ও উদ্দেশ্যপূর্ণ জীবন, এটাই তো শেখায়। পরিবার মজবুত রাখা, সামাজিক সংহতি রক্ষা, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন, পরিবেশ-নির্ভরতা—এসব ইসলামের শিক্ষা। আজকের সমাজ যেখানে ব্যক্তি স্বাধীনতা-স্বার্থই বড়, সেখানে ইসলাম বলে ব্যক্তি আর সমাজ, দু’দিকেই ভারসাম্য থাকতে হবে।
নৈতিক পুনর্গঠনের প্রয়োজন
শুধু আইনি বদল বা প্রশাসনিক কড়াকড়িতে এই সংকট কাটে না। দরকার ভেতর থেকে পাল্টানো—আত্মশুদ্ধি, চরিত্র গঠন, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন। ইসলাম তাকওয়ার কথা বলে, আল্লাহভীতিই মানুষকে সত্য পথে রাখে, বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই। এতে মানুষ যেমন নিজেকে চেনে, তেমনি সঠিক সিদ্ধান্তও নিতে পারে।
সাথে, আজকের বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আর মূল্যবোধের সমন্বয়টা খুবই জরুরি। প্রযুক্তি নিজে খারাপ না, ভালোও না—ব্যবহারটা নির্ভর করছে কীভাবে করছি, কী উদ্দেশ্যে করছি। জ্ঞান আর প্রযুক্তি যখন নৈতিক দৃশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখনই তা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
উপসংহার
আধুনিক সভ্যতা, তার সব চকমকির মধ্যেও, ঠিক কোন পথে যাচ্ছে সেই দিক-বোধের অভাব নিয়েই চলছে। সংকট কাটাতে গেলে মানুষকে দুটো ব্যাপারকে একসাথে দেখতে হবে—বাইরের আর ভেতরের চাহিদা। ইসলামি জীবনবোধ এখানে একটা পূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান দেখায়। এখানে জ্ঞান-নৈতিকতা, স্বাধীনতা-সমাজবোধ—সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা। অর্থাৎ, শুধু ভোগ-বিলাস আর প্রতিযোগিতার গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে, অর্থবোধক আর দায়িত্বশীল জীবন গড়ার পথ এখানেই মেলে।
(এই লেখা “সভ্যতা-সংকট দিগ-দর্শন” বইটি পড়ার আগ্রহ জাগানোর জন্যই। যেটুকু বলা গেল, সবটা জানতে হলে বইটা পড়াই ভালো।)

إرسال تعليق