![]() |
| ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা) |
ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা)
লেখক : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যাহ রহ, অনুবাদক : আশরাফুল আলম সাকিফ, সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল মাসউদ, শাইখ মানজুরুল কারীম
প্রকাশনী : সত্যায়ন প্রকাশন
বিষয় : আত্মশুদ্ধি ও অনুপ্রেরণা
লেখক : আল্লামা ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যাহ রহ, অনুবাদক : আশরাফুল আলম সাকিফ, সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল মাসউদ, শাইখ মানজুরুল কারীম
প্রকাশনী : সত্যায়ন প্রকাশন
বিষয় : আত্মশুদ্ধি ও অনুপ্রেরণা
আরো পড়ুন-
ওয়াসওয়াসা: শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার পথ
ভূমিকা
সব মানুষের মনেই নানারকম ভাবনা চলে আসে। কিছু নিজের ভেতর থেকে, কিছু ফেরেশতার ভালো অনুপ্রেরণা হিসেবে, আর কিছু আসে শয়তানের ফিসফিসি কুমন্ত্রণা—যাকে বলা হয় ওয়াসওয়াসা। “ওয়াসওয়াসা” একটি আরবি শব্দ, মানে গোপনে সন্দেহ বা অস্থিরতা ছড়ানো। ইমাম ইবনুল কায়্যিম জাওযিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ অনেক বইতে এই ব্যাপারটা ভেঙে বলেছিলেন—শয়তান কীভাবে মানুষের মনে ভয়, সংশয় আর অহেতুক দুশ্চিন্তা ঢুকিয়ে দেয়, আর একজন মুমিন কীভাবে এই কুমন্ত্রণা থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
ওয়াসওয়াসা আসলে কী
ওয়াসওয়াসা হচ্ছে এমন এক মানসিক চাপ, যা হঠাৎ করে মনের মধ্যে অস্থিরতা ছড়ায়। এটা বিশ্বাস, ইবাদত, আকীদা—এমনকি খুব সাধারণ ব্যাপারেও ঘাঁটাতে পারে। কখনো আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ এনে দেয়, কখনো নামাজ-রোজার ঠিক হলো কি না ভেবে অযথা উৎকন্ঠা তৈরি করে। আবার কখনো পরিবার বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অকারণ দুশ্চিন্তা নিয়ে আসে। আল্লাহ কুরআনে বলেছেন—শয়তান মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দেয়। সে প্রকাশ্যে করে না, বরং চুপিসারে বলে।
সূরা নাসে আল্লাহ স্পষ্টভাবে শয়তানের এসব কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে বলেছেন। এখানে বলা হয়েছে, এই কুমন্ত্রণা আসতে পারে শুধু জিন থেকে নয়, মানুষের মাধ্যমেও।
ওয়াসওয়াসার উৎস ও কারণ
ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ জানিয়েছেন, ওয়াসওয়াসার মূলত দুটি দিকে উৎস। এক, শয়তান নিজের দিক থেকে মানুষের মনে সন্দেহ আর খারাপ চিন্তা ঢেলে দেয়। দুই, নিজের প্রবৃত্তি বা দুর্বল মানসিক চেতনা এসব কুমন্ত্রণাকে আরও শক্তিশালী বানায়। যখন কারও ঈমান দুর্বল, আল্লাহর কথা ভুলে যায় বা অহেতুক ভেবে বেড়ায়, তখন শয়তান সুযোগ খুঁজে পায়।
আরো কিছু কারণও আছে—মন-মেজাজ দুর্বল থাকা, একা থাকা, বেশি চিন্তা করা, গুনাহর মধ্যে থাকা, আর আল্লাহর যিকির ভুলে যাওয়া। শয়তান খুব কৌশলে এগুলো ঢোকায়, যাতে মানুষ মনে করে এটা হয়তো তার নিজেরই চিন্তা।
ওয়াসওয়াসার ধরন
আলেমরা কয়েকভাবে ওয়াসওয়াসাকে ভাগ করেছেন। প্রথমত, আকীদার দিক—এতে আল্লাহর অস্তিত্ব বা একত্ববাদ নিয়ে সন্দেহ হয়। দ্বিতীয়ত, ইবাদতের ক্ষেত্র—ওজু বা নামাজ ঠিক হলো কি না বারবার সন্দেহ, বারবার রিপিট করে ফেলা। তৃতীয়ত, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত জীবন—ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, সম্পর্ক নিয়ে অনিশ্চয়তা বা নিজের সম্পর্কে খারাপ ভাবনা।
ইবাদতের ব্যাপারে ওয়াসওয়াসা অনেক সময় মানুষকে ক্লান্ত আর বিরক্ত করে তোলে। এতে ইবাদতকে একসময় বোঝা মনে হয়, অনেকে ধীরে ধীরে ইবাদত থেকেও দূরে চলে যায়।
ওয়াসওয়াসার খারাপ দিক
ওয়াসওয়াসা মানুষকে মানসিক শান্তি থেকে বঞ্চিত করে। মনে বাড়তি ভয়, অস্থিরতা আর ডাউট তৈরি হয়। এতে কেউ কেউ আল্লাহর উপর ভরসা ভুলে যায়। ধীরে ধীরে ইবাদতে অনীহা, সম্পর্কের দূরত্ব, কিংবা মানসিক ক্লান্তি পেয়ে বসে। কেউ আবার ওয়াসওয়াসার ভয়ে সহজ জিনিসকেও জটিল বানিয়ে ফেলে—যা ইসলামের সহজ-সরল মূলবোধের সঙ্গে যায় না। আসলে ইসলাম সহজতার বার্তা দেয়; আর ওয়াসওয়াসা মানুষকে বাড়তি ঝামেলায় ফেলে।
ওয়াসওয়াসা থেকে মুক্তির উপায়
ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহসহ অনেক আলেম এই কুমন্ত্রণা ঠেকাতে কিছু সহজ পদ্ধতি বলেছেন—
১. আগে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। কুরআনে যেমন আছে, সালাত বা অন্য কোনো ইবাদতে কুমন্ত্রণা এলে সাথে সাথে আল্লাহর আশ্রয় চাইতে হবে, তাঁর স্মরণ করতে হবে।
২. ওয়াসওয়াসাকে পাত্তা দিলে চলবে না। মনে রাখুন, যত বেশি গুরুত্ব দেবেন, এগুলো ততই জেঁকে বসবে। তাই এগুলো আসা মাত্র মন অন্যদিকে ফেরান।
৩. দ্বীনি জ্ঞান বাড়ান। অধিকাংশ সন্দেহের কারণ অজ্ঞতা। জানলে ওয়াসওয়াসার অনেক কিছু সহজে কেটে যায়।
৪. নিয়মিত যিকির, দোয়া আর কুরআন পড়ুন। এগুলো মন ঠান্ডা রাখে, শয়তানের প্রভাব কমিয়ে দেয়।
৫. নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। অলস সময় আর পরিকল্পনাহীনতা ওয়াসওয়াসার জন্য আস্তে আস্তে দরজা খুলে দেয়।
৬. আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন। ইবাদত বা কাজ শেষে অকারণ দ্বিধা না করে নিজের চেষ্টায় সন্তুষ্ট থাকুন, বাকিটা আল্লাহর হাতে ছাড়ুন।
উপসংহার
ওয়াসওয়াসা আসলে মানুষের জন্য স্বাভাবিক এক পরীক্ষা। এটা আপনার দুর্বলতা নয়, বরং শয়তানের চাল। জ্ঞান, ধৈর্য আর আল্লাহর স্মরণে এগুলোর মোকাবেলা করা সম্ভব। ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহসহ বড় বড় আলেমরা বলেছেন—ওয়াসওয়াসা পুরোপুরি চলে না গেলেও, সঠিক বোঝাপড়া আর আমলে এর চাপ অনেক কমে যায়। তাই সচেতন থাকুন, নিয়মিত অন্তর পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করুন, আল্লাহর সাহায্য চান—মন শান্ত থাকবে।
এই লেখাটি ওয়াসওয়াসা নিয়ে ইসলামের সাধারণ জ্ঞানের আলোকে লেখা। আরও বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য উদ্ধৃতির জন্য "ওয়াসওয়াসা (শয়তানের কুমন্ত্রণা)" বইটি পড়ে নিতে পারেন।

إرسال تعليق