![]() |
| শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় (তালবিসে ইবলিস) |
শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় (তালবিসে ইবলিস)
লেখক : আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহঃ)
প্রকাশনী : দারুল আরকাম
বিষয় : কিয়ামতের আলামত, ফিতনা
আরো পড়ুন-
শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয় (তালবিসে ইবলিস)
ভূমিকা
শয়তানের ধোঁকা নতুন কোনো বিষয় নয়। মানবজাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই ইবলিস মানুষকে সত্যের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। কখনো সে সরাসরি পাপের দিকে টানে, আবার কখনো ভালো কাজের আড়ালে এমনভাবে প্ররোচিত করে যে মানুষ বুঝতেই পারে না—সে আসলে প্রতারণার ফাঁদে পা দিচ্ছে। কুরআন ও হাদিসে তাই ইবলিসের কৌশল সম্পর্কে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
এই বিষয়টিকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা ইসলামি সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হলো “তালবিসে ইবলিস”—অর্থাৎ শয়তান যেভাবে ধোঁকা দেয়। গ্রন্থটির রচয়িতা প্রখ্যাত আলেম, মুহাদ্দিস ও ফকীহ আল্লামা ইবনুল জাওযী (রহঃ)। শয়তান কীভাবে মানুষের বিশ্বাস, চিন্তা, ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার করে—বিভিন্ন উদাহরণ ও দলিলের মাধ্যমে তিনি তা তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশে দারুল আরকাম প্রকাশনী গ্রন্থটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে।
লেখক পরিচিতি
আবুল ফারাজ আব্দুর রহমান ইবনুল জাওযী (রহঃ) ছিলেন হাম্বলি মাযহাবের অন্যতম প্রসিদ্ধ আলেম। বাগদাদে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। হাদিস, ফিকহ, তাফসির, ইতিহাস এবং ওয়াজ-নসিহতের ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন।
তাঁর নামে বহু গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়। এর মধ্যে “তালবিসে ইবলিস” বিশেষভাবে আলোচিত। তাঁর সময়ের মুসলিম সমাজে ছড়িয়ে পড়া বিদআত, কুসংস্কার, ভ্রান্ত ধারণা ও ধর্মীয় বাড়াবাড়ি নিয়ে তিনি গভীরভাবে চিন্তা করতেন। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন এই গ্রন্থে দেখা যায়।
গ্রন্থের মূল বিষয়বস্তু
“তালবিসে ইবলিস”-এর মূল আলোচনার কেন্দ্র হলো—শয়তান কীভাবে মানুষকে ধোঁকা দেয় এবং কীভাবে একজন মানুষ নিজের অজান্তেই সেই ধোঁকার শিকার হয়ে যেতে পারে।
ইবনুল জাওযী (রহঃ) দেখিয়েছেন, শয়তান সব সময় মানুষকে প্রকাশ্য পাপের দিকে আহ্বান করে না। অনেক সময় সে ভালো কাজের মধ্যেই এমন কিছু মিশিয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়। কখনো জ্ঞানের মাধ্যমে অহংকার তৈরি করে, কখনো ইবাদতের মধ্যে লোক দেখানো ঢুকিয়ে দেয়, আবার কখনো অতিরিক্ত কঠোরতার মাধ্যমে ভারসাম্য নষ্ট করে।
গ্রন্থে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ক্ষেত্রে শয়তানের কৌশল আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
আলেমদের ক্ষেত্রে শয়তানের ধোঁকা প্রকাশ পেতে পারে জ্ঞানের অহংকার, মানুষের প্রশংসার প্রতি আকর্ষণ কিংবা ধর্মীয় জ্ঞানকে দুনিয়াবি স্বার্থে ব্যবহারের মাধ্যমে।
ইবাদতকারীদের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি, আত্মতুষ্টি, লোক দেখানো কিংবা শরিয়তসম্মত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে ইবাদত করার প্রবণতা।
সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে শয়তানের প্ররোচনা নানা রূপ নিতে পারে—কুসংস্কার, অন্ধ অনুকরণ, প্রবৃত্তির অনুসরণ কিংবা এমন কিছু বিনোদন ও অভ্যাসের মাধ্যমে, যা ধীরে ধীরে মানুষকে দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
গ্রন্থে শয়তানের সৃষ্টি, আদম (আঃ)-এর সঙ্গে তার ঘটনা এবং মানবজাতিকে বিভ্রান্ত করার তার অঙ্গীকার সম্পর্কেও আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধারা ও অনুশীলনের কিছু দিক সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে, বিশেষ করে যেসব আচরণ লেখকের দৃষ্টিতে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গ্রন্থের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য
“তালবিসে ইবলিস”-এর অন্যতম শক্তিশালী দিক হলো এর বিশ্লেষণধর্মী পদ্ধতি। ইবনুল জাওযী (রহঃ) শুধু সতর্ক করেননি; বরং বিভিন্ন বিষয়ের পেছনে থাকা কারণ ও প্রবণতাগুলোও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। কুরআনের আয়াত, হাদিস এবং সালাফদের বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি তাঁর আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছেন।
আরেকটি বিষয় এই গ্রন্থকে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে—শয়তানের কৌশল সময়ের সঙ্গে বদলালেও তার মূল উদ্দেশ্য বদলায় না।
আজকের যুগে প্রতারণার মাধ্যম হয়তো অনেক বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অতিরিক্ত বিনোদন, ভ্রান্ত তথ্য, ধর্মীয় উগ্রতা কিংবা ধর্মের প্রতি উদাসীনতা—সবকিছুই মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে শয়তানের ধোঁকার ধরন বুঝতে হলে শুধু প্রকাশ্য পাপের দিকে তাকালেই হবে না; নিজের চিন্তা, উদ্দেশ্য ও কাজের ভেতরেও নজর দিতে হবে।
এই আত্মসমালোচনার জায়গাটিই বইটির অন্যতম বড় শিক্ষা।
দারুল আরকাম সংস্করণ
বাংলাদেশে দারুল আরকাম প্রকাশনী প্রকাশিত বাংলা সংস্করণটি বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য গ্রন্থটির বিষয়বস্তু সহজভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছে। মূল আরবি গ্রন্থের বিষয়বস্তু ও পরিভাষাকে পাঠকের বোধগম্য করে তুলে ধরাই অনুবাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
দ্বীনি শিক্ষার্থী, গবেষণামূলক পাঠে আগ্রহী ব্যক্তি কিংবা নিজের আমল ও চিন্তাভাবনা নিয়ে আত্মসমালোচনা করতে চান—এমন পাঠকদের জন্য বইটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।
শেষকথা
“তালবিসে ইবলিস” শুধু শয়তানের কৌশল সম্পর্কে একটি বই নয়; এটি নিজের ভেতরের দুর্বলতাগুলো চিনে নেওয়ারও একটি সুযোগ। কারণ শয়তানের সবচেয়ে বড় সাফল্য তখনই, যখন মানুষ ভুল কাজকে ভুল মনে না করে বরং সেটাকেই সঠিক মনে করতে শুরু করে।
তাই বইটি পড়ার সময় শুধু অন্যদের ভুল খুঁজে দেখার পরিবর্তে নিজের চিন্তা, নিয়ত, ইবাদত ও অভ্যাসের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কোথাও অহংকার ঢুকে পড়ছে কি না, ভালো কাজের মধ্যে লোক দেখানো চলে আসছে কি না, কিংবা দ্বীনের নামে কোনো বিষয়ে অযথা বাড়াবাড়ি করছি কি না—এ ধরনের প্রশ্ন নিজের সামনে রাখা যায়।
ফিতনা ও বিভ্রান্তির নানা মাধ্যমের এই সময়ে, শয়তানের কৌশল সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের পথ যাচাই করা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। “তালবিসে ইবলিস” সেই আত্মসচেতনতার পথে একটি চিন্তাশীল ও আলোচনাসমৃদ্ধ পাঠ হতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: অনুগ্রহ করে VPN ব্যবহার করুন।

إرسال تعليق