দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি: টিম মার্শাল - The Power of Geography: Tim Marshall

দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি
দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি

দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি
লেখক : টিম মার্শাল
প্রকাশনী : পুঁথি
বিষয় : রাজনীতি

আরও পড়ুন-

দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি — টিম মার্শাল

লেখক পরিচিতি
টিম মার্শাল একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও ভূরাজনীতি বিশ্লেষক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংঘাত নিয়ে কাজ করেছেন। স্কাই নিউজের ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি বিবিসি ও এলবিসি/আইআরএন রেডিওতেও কাজ করেছেন। বিশ্বের প্রায় চল্লিশটি দেশ থেকে তিনি সংবাদ সংগ্রহ করেছেন এবং ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, কসোভো, আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে রিপোর্ট করেছেন। "Simon & Schuster" 

তাঁর বহুল আলোচিত বই Prisoners of Geography আন্তর্জাতিকভাবে বেস্টসেলার হওয়ার পর ভূরাজনীতি নিয়ে সাধারণ পাঠকের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। সেই বইয়ে মার্শাল দেখিয়েছিলেন, পাহাড়, নদী, সমুদ্র ও সীমান্তের মতো ভৌগোলিক বাস্তবতা কীভাবে একটি দেশের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কৌশলকে প্রভাবিত করে। The Power of Geography সেই ভাবনারই পরবর্তী অধ্যায়—তবে এখানে আলোচনার পরিসর আরও বিস্তৃত।

বইটির মূল বিষয়
২০২১ সালে প্রকাশিত The Power of Geography বইয়ে টিম মার্শাল ভবিষ্যৎ বিশ্বরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এমন দশটি দেশ, অঞ্চল ও ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। এগুলো হলো—অস্ট্রেলিয়া, ইরান, সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, গ্রিস, তুরস্ক, সাহেল অঞ্চল, ইথিওপিয়া, স্পেন এবং মহাকাশ। "Academia.edu"

প্রতিটি অধ্যায়ে ভূগোলের সঙ্গে ইতিহাস, অর্থনীতি ও সমসাময়িক রাজনীতিকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। মার্শালের মূল বক্তব্য খুব সরল: ভূগোল কোনো দেশের ভবিষ্যৎ একাই নির্ধারণ করে না, কিন্তু একটি দেশের সামনে কী কী সুযোগ ও সীমাবদ্ধতা থাকবে, তার ওপর ভূগোলের গভীর প্রভাব থাকে।

কোনো দেশের পাহাড়ি সীমান্ত তাকে কতটা নিরাপদ রাখবে, সমুদ্রপথ তাকে বাণিজ্যে কতটা সুবিধা দেবে, প্রাকৃতিক সম্পদ তার অর্থনীতিকে কীভাবে বদলে দেবে কিংবা কোনো জনগোষ্ঠী ভৌগোলিকভাবে কোথায় কেন্দ্রীভূত—এসব প্রশ্নের সঙ্গে রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বইটি সেই সম্পর্কটাই সহজ ভাষায় বোঝানোর চেষ্টা করে।

অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা
প্রতিটি অধ্যায়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশের বা অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে ইতিহাস, অর্থনীতি এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে আলোচনা এগিয়েছে। ফলে মানচিত্রের তথ্যগুলো নিছক ভৌগোলিক বর্ণনা হয়ে থাকেনি; বরং সেগুলোকে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

- অস্ট্রেলিয়া: চীনকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান কীভাবে বদলাচ্ছে, তা এখানে আলোচিত হয়েছে।

- ইরান: ইরানের পার্বত্য ভূপ্রকৃতি ও বিস্তৃত মরুভূমি দেশটিকে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বহিরাগত আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুবিধা দিয়েছে। দুর্গম ভূখণ্ড কীভাবে কোনো বিজয়ী শক্তির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ কঠিন করে তুলতে পারে, মার্শাল সেটিও ব্যাখ্যা করেছেন। "Shortform" 

- সাহেল: আফ্রিকার এই বিশাল অঞ্চলের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, সন্ত্রাসবাদ ও অভিবাসনের মতো বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত, তা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবর্তিত পরিবেশ এবং ‘গ্রেট গ্রিন ওয়াল’ প্রকল্পের সীমাবদ্ধতার কথাও এসেছে। "Mrs Geography"

- ইথিওপিয়া: নীল নদের ওপর বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মাধ্যমে ইথিওপিয়া কীভাবে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে এবং এর ফলে মিশরের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক কীভাবে প্রভাবিত হতে পারে, সে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

- যুক্তরাজ্য: ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের অবস্থান, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

- স্পেন, গ্রিস ও তুরস্ক: ইউরোপের ভূরাজনীতি, অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট এবং বিভিন্ন স্বাধীনতাকামী আন্দোলনের প্রভাব এই অধ্যায়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

- মহাকাশ: বইটির শেষ অধ্যায়টি অন্যগুলোর তুলনায় বেশ আলাদা। মার্শাল দেখিয়েছেন, পৃথিবীর বাইরে মহাকাশও এখন ক্ষমতা, নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে।

বইটির কেন্দ্রীয় ধারণা
মার্শালের দৃষ্টিতে বিশ্বরাজনীতি ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এখানে শুধু যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিই নয়; অপেক্ষাকৃত ছোট দেশ ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। "SoBrief"

অভিবাসন, প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—এসব আলাদা আলাদা বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে জড়িত। আর সেই যোগসূত্রের একটি বড় অংশ তৈরি করে ভূগোল।

এই কারণেই বইটি শুধু মানচিত্র বা দেশভিত্তিক আলোচনা নয়। বরং এটি বোঝার চেষ্টা করে, একটি দেশের অবস্থান, প্রতিবেশী রাষ্ট্র, প্রাকৃতিক সম্পদ ও ভূপ্রকৃতি তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে।

লেখার ধরন
টিম মার্শালের অন্যতম শক্তি হলো জটিল ভূরাজনৈতিক বিষয়কে সহজ ভাষায় তুলে ধরা। তিনি একাডেমিক আলোচনার মতো ভারী ভাষা ব্যবহার না করে ইতিহাস, মানচিত্র ও বর্তমান ঘটনাকে একসঙ্গে মিলিয়ে গল্পের মতো করে বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করেন। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে আগে থেকে খুব বেশি ধারণা না থাকলেও বইটির মূল বক্তব্য অনুসরণ করা তুলনামূলক সহজ। "SoBrief"

সমালোচনা ও পাঠক প্রতিক্রিয়া
বইটি প্রশংসা পেলেও সমালোচনা একেবারে নেই তা নয়। কিছু পাঠকের মতে, Prisoners of Geography-এর তুলনায় The Power of Geography কিছুটা বেশি বিস্তৃত এবং কম কেন্দ্রীভূত মনে হতে পারে। আগের বইয়ে পাহাড়, নদী, উপকূল ও সীমান্তের মতো ভৌত ভূগোলের ওপর বেশি জোর ছিল। এখানে জলবায়ু, অভিবাসন ও জনসংখ্যার মতো বিষয় যুক্ত হওয়ায় আলোচনার পরিধি বেড়েছে—তবে এর ফলে কিছু অংশ কারও কাছে তুলনামূলকভাবে বিক্ষিপ্ত মনে হতে পারে। "Goodreads"

তারপরও বইটির বড় সাফল্য হলো—এটি পাঠককে বিশ্বরাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি পরস্পর-সংযুক্ত ব্যবস্থা হিসেবে ভাবতে শেখায়।

বাংলাদেশে প্রকাশনা
বাংলাদেশে পুঁথি প্রকাশনী থেকে বইটির বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি ও বিশ্বপরিস্থিতি নিয়ে আগ্রহী বাংলাভাষী পাঠকদের জন্য বইটির আলোচনা আরও সহজে পৌঁছে গেছে।

শেষ কথা
দ্য পাওয়ার অব জিওগ্রাফি পড়লে একটি বিষয় বারবার সামনে আসে—মানচিত্রের রেখাগুলো নিছক সীমানা নয়। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, মরুভূমি, সম্পদ ও ভৌগোলিক অবস্থান একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

যারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভূরাজনীতি কিংবা বিশ্ব ইতিহাসকে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে বুঝতে চান, তাদের জন্য টিম মার্শালের এই বইটি বেশ কার্যকর একটি পাঠ। বিশেষ করে Prisoners of Geography ভালো লেগে থাকলে, The Power of Geography সেই আলোচনাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যায়।

Post a Comment

أحدث أقدم