![]() |
| শেষ প্রান্তর |
শেষ প্রান্তর
লেখক : নসীম হিজাযী
প্রকাশনী : বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিঃ
বিষয় : ইসলামি সাহিত্য
আরো পরুন-
শেষ প্রান্তর: ইতিহাসের অগ্নিগর্ভ থেকে উঠে আসা এক প্রতিরোধের গাথা
ভূমিকা
উপমহাদেশের ঐতিহাসিক উপন্যাসের জগতে নসীম হিজাযীর নাম বিশেষ মর্যাদার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। ১৯১৪ সালে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলায় জন্ম নেওয়া এই উর্দু সাহিত্যিক ইতিহাসের নানা সংকটময় অধ্যায়কে অবলম্বন করে লিখেছেন একাধিক জনপ্রিয় উপন্যাস। তাঁর লেখায় ইতিহাস শুধু অতীতের ঘটনা হয়ে থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় আত্মপরিচয়, বিশ্বাস, সংগ্রাম ও প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকার চেতনা।
তাঁর অন্যতম আলোচিত উপন্যাস ‘আখেরী চাটান’, যার বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ‘শেষ প্রান্তর’ নামে। বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড প্রকাশিত এই গ্রন্থটি বাংলা ভাষাভাষী ইসলামি সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত।
ঐতিহাসিক পটভূমি
‘শেষ প্রান্তর’-এর কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে তেরো শতকের মঙ্গোল আগ্রাসনের ভয়াবহ সময়। মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে উঠে আসা চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী একের পর এক জনপদ ও নগরীর ওপর আক্রমণ চালায়। মধ্য এশিয়ার সমৃদ্ধ মুসলিম নগরীগুলোর অনেকগুলোই সেই ধ্বংসাত্মক অভিযানের শিকার হয়।
এই বিপর্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল খারেজম সাম্রাজ্যের পতন। সেই সময়ের প্রতিরোধের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন খারেজম শাহের পুত্র জালালউদ্দিন মানকুবার্নি। চারপাশে বিপর্যয় নেমে এলেও তিনি আত্মসমর্পণ না করে মঙ্গোল শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান।
নসীম হিজাযী এই ঐতিহাসিক চরিত্র ও ঘটনাপ্রবাহকে অবলম্বন করে উপন্যাসের কাহিনি নির্মাণ করেছেন। ইতিহাসের মূল কাঠামো ধরে রাখার পাশাপাশি সাহিত্যিক কল্পনা ও চরিত্রের মানবিক দিক যুক্ত করে তিনি ঘটনাগুলোকে পাঠকের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলেছেন।
উপন্যাসের মূল সুর
নসীম হিজাযীর লেখার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি যুদ্ধ ও রাজনীতির বাইরেও গল্পের ভেতরে একটি নৈতিক ও আদর্শিক বার্তা খুঁজে নেন। ‘শেষ প্রান্তর’-এও সেই প্রবণতা স্পষ্ট।
বিপর্যয় যত গভীরই হোক, বিশ্বাস, সাহস, আত্মত্যাগ এবং আদর্শের প্রতি দৃঢ়তা মানুষকে কীভাবে প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়ানোর শক্তি দেয়—উপন্যাসের বিভিন্ন ঘটনায় এই ভাবনাই বারবার ফিরে আসে। জালালউদ্দিনের সংগ্রাম তাই শুধু একজন শাসকের যুদ্ধ নয়; এটি পরাজয় ও ধ্বংসের মুখেও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
এই কারণেই ‘শেষ প্রান্তর’ নিছক একটি যুদ্ধকাহিনি হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর ভেতরে রয়েছে সংকটের সময়ে মানুষের মানসিক দৃঢ়তা এবং বিশ্বাস ধরে রাখার গল্প।
সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য
নসীম হিজাযীর লেখায় সাংবাদিকতার তথ্যনিষ্ঠতা এবং কথাসাহিত্যের নাটকীয়তা পাশাপাশি কাজ করেছে। ইতিহাসকে কেবল তথ্যের স্তূপ হিসেবে না রেখে তিনি ঘটনাগুলোকে চরিত্র, সংলাপ, দ্বন্দ্ব ও আবেগের মধ্য দিয়ে উপস্থাপন করেছেন।
যুদ্ধের উত্তেজনাপূর্ণ দৃশ্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং ব্যক্তিগত সংকটও তাঁর কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পেয়েছে। ফলে পাঠক শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ঘটনাই দেখেন না; সেই সময়ের মানুষ, সমাজ ও রাজনীতির নানা দিকও অনুভব করতে পারেন।
তাঁর বর্ণনাভঙ্গি সাধারণত সাবলীল ও গতিশীল। ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদেরও তিনি একমাত্রিক চরিত্র হিসেবে দেখাননি; তাঁদের সিদ্ধান্ত, দ্বিধা, সাহস ও সংকটের মানবিক দিকগুলো গল্পের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
গুরুত্ব ও প্রভাব
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের মধ্যে নসীম হিজাযীর উপন্যাস দীর্ঘদিন ধরে ইতিহাসভিত্তিক সাহিত্য পাঠের একটি পরিচিত নাম। তাঁর বইয়ের মাধ্যমে অনেক পাঠক মধ্যযুগের মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও চরিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন।
‘শেষ প্রান্তর’ও সেই ধারার একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। ইতিহাসের একটি অস্থির সময়কে কাহিনির মাধ্যমে তুলে ধরার পাশাপাশি এটি পাঠককে সাহস, আত্মত্যাগ, বিশ্বাস ও প্রতিরোধের মতো বিষয় নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে।
বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেডের প্রকাশিত বাংলা সংস্করণটি তাই নসীম হিজাযীর ঐতিহাসিক সাহিত্যকে বাংলা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
শেষ কথা
‘শেষ প্রান্তর’ শুধু অতীতের একটি যুদ্ধের গল্প নয়। এটি ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও প্রতিরোধের পথ বেছে নেওয়া মানুষের গল্প; সংকটের মধ্যেও বিশ্বাস ও আদর্শ আঁকড়ে থাকার গল্প।
নসীম হিজাযী তেরো শতকের সেই অস্থির সময়কে ইতিহাস ও কল্পনার সমন্বয়ে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পাঠককে একই সঙ্গে গল্পের ভেতরে টেনে নেয় এবং ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। ইতিহাসের আবহ, রোমাঞ্চকর ঘটনাপ্রবাহ এবং নৈতিক দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে ‘শেষ প্রান্তর’ ঐতিহাসিক উপন্যাসপ্রেমীদের জন্য একটি স্মরণীয় পাঠ।

إرسال تعليق