প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি: টিম মার্শাল - Prisoners of geography: Tim Marshall

প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি
প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি

প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি
লেখক : টিম মার্শাল
অনুবাদক : হাসান গালিব
প্রকাশনী : নিয়ন
বিষয় : অনুবাদ, ভূগোল ও পরিবেশ

আরো পড়ুন-

প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি—এই বইটা ভূরাজনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। ২০১৫ সালে টিম মার্শাল ইংরেজিতে লিখেছিলেন, আর বাংলাদেশে হাসান গালিব এটাকে “নিয়ন” প্রকাশনীর ব্যানারে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। বইটা প্রকাশের পর থেকেই আমাদের পাঠকরা ভূগোল আর আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে।

লেখকের কথা বললে, টিম মার্শাল আসলে সাংবাদিক হিসেবে দারুণ অভিজ্ঞ। বিবিসি, স্কাই নিউজ, এলবিসি—যেখানে সেখানে তিনি আন্তর্জাতিক বিষয় আর কূটনীতির খবর করেছেন। বলকান যুদ্ধ, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া—এমন সব জটিল জায়গা থেকে প্রায় তিরিশ বছর ধরে রিপোর্টিং করেছেন। কাজেই, তার লেখায় পরিষ্কার বোঝা যায়, লোকটা মাঠে কী দেখেছেন আর আসলে কী ভাবছেন।

বইটার মূল বক্তব্য সহজ—একটা দেশের ভূগোলই নাকি তার রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, ইতিহাস এসবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পাহাড়, মরুভূমি, নদী, জলবায়ু, প্রাকৃতিক সম্পদ—এগুলোই অনেক সময় একটা দেশের নেতা যতই চালাক বা মরনীয় হন না কেন, তাদের সিদ্ধান্তের সীমা ঠিক করে দেয়। হয়তো আপনার কৌশল ভীষণ ভালো, তবু আপনি ভূগোলকে ডিঙোতে পারবেন না বলেই তিনি বলছেন—সবশেষে সবাই ভূগোলের বন্দি।

এই ভাবনাটা তিনি বইয়ের দশটা অধ্যায়ে ভেঙে ভেঙে দেখিয়েছেন, প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতেই মানচিত্র দিয়ে বোঝান কোন অঞ্চল বা দেশ নিয়ে তিনি আলোচনা করছেন। যেমন—

১. রাশিয়া: এত বড়ো দেশ অথচ প্রাকৃতিক সীমান্ত ঠিক নেই, এতেই তাদের নিরাপত্তা-ধাক্কা আর সম্প্রসারণ নীতি।
২. চীন: পাহাড়, মরুভূমি আর সমুদ্র এদের রক্ষা করেছে ঠিকই, কিন্তু সমুদ্রপথে প্রভাব বাড়ানোর দরকারও বড়।
৩. যুক্তরাষ্ট্র: দুই পাশের মহাসাগর, পাহাড়-জঙ্গল আর প্রচুর সম্পদ—এসব আমেরিকাকে অবিশ্বাস্য নিরাপত্তা দিয়েছে।
৪. পশ্চিম ইউরোপ: নদী আর সমতলে যুদ্ধ আর বাণিজ্য, দুটোই সহজ। দুই মুখ আছে।
৫. আফ্রিকা: শাসকদের ইচ্ছামত আঁকা সীমান্ত জাতিগত সংঘাত আর অনুন্নয়নের প্রধান কারণ।
৬. মধ্যপ্রাচ্য: তেল, ধর্ম, কৃত্রিম সীমান্ত—সব মিলিয়ে এই অঞ্চলটা অস্থির আর জটিল।
৭. ভারত-পাকিস্তান: হিমালয়, কাশ্মীর—আর চিরশত্রু দুই পাশের সম্পর্ক।
৮. কোরিয়া-জাপান: দ্বীপ আর উপদ্বীপের অবস্থানের কারণে চীন, জাপান, কোরিয়া—সব মিলিয়ে পাওয়া জটলাপাকানো সম্পর্ক।
৯. লাতিন আমেরিকা: আন্দিজ পর্বত আর আমাজন জঙ্গল অর্থনীতির বড়ো বাধা।
১০. আর্কটিক: জলবায়ু পরিবর্তনে বরফ গলে যাওয়ায় নতুন প্রতিযোগিতার মাঠ সাজাচ্ছে।

স্টাইলের দিক থেকে বলতে গেলে, মার্শালের লেখা সহজ আর প্রাণবন্ত। জটিল বিষয়কে সাধারণভাবে বোঝা যায়, সঙ্গে ইতিহাস, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—সব মিশিয়ে একজন সাধারণ পাঠকও সহজে ঘুনে যেতে পারে। মানচিত্রও তিনি ভালো বাছাই করেছেন, তাই যার ভূগোল একটু দুর্বল, তারও বুঝতে কষ্ট হয় না।

বইটা ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার হয়ে গেছে, নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ অনেক জায়গায় তালিকায় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও এটা রেফারেন্স বই হিসেবে পড়ছে।

তবে সমালোচনা আছে, কেউ কেউ বলেন—এতে ভূগোলের নির্ধারণবাদই বেশি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ব্যক্তি বা লিডারশিপের প্রভাব কম এসেছে। তবু উদ্যোগ আর সহজবোধ্য লেখার জন্য, ভূরাজনীতি চেনানোর বই হিসেবে বইটা সবাই পছন্দ করেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে, এই ধরনের বই আমাদের মানুষের মাঝে আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়িয়েছে। হাসান গালিবের অনুবাদটা বেশ প্রাণবন্ত হয়েছে, জটিল বিষয়-টপিকও সহজে পড়ে ফেলা যায়। বিশেষ করে, যারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দক্ষিণ চীন সাগরের ঘটনা, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা, ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক—এসব নিয়ে একটু গভীরে বুঝতে চান, তাদের বইটা বেশ কাজে দেবে।

সব মিলিয়ে—এক কথায় “প্রিজনার্স অব জিওগ্রাফি” শেখায়, বিশ্ব-রাজনীতি দেখতে গেলে ভূগোল ছাড়া গতি নেই। কে নিরাপত্তাহীন থাকবে কিংবা কেইবা পরাশক্তি হবে অথবা অমীমাংসিত সংঘাত কেন কালে কালে থেকে যায়—এসব প্রশ্নের সহজ, স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য উত্তর বইটা সামনে দেয়।

Post a Comment

أحدث أقدم