![]() |
| বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার |
বঙ্গবিজেতা বখতিয়ার
লেখক : মুহাম্মাদ সাদ সাকী
প্রকাশনী : বাতায়ন পাবলিকেশন
বিষয় : ইতিহাস ও ঐতিহ্য
আরো পরুন-
দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, বইপ্রেমীদের মধ্যে তো বটেই, যারা মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে একটু গভীরে ভাবেন তারাও এই বইটা নিয়ে বেশ আলোচনা করছেন। সোহেল রানা, পেশায় সাংবাদিক, দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য পর্যবেক্ষণে ডুবে আছেন—তার এই প্রথম বইটাই যেন একটু আলাদা গন্ধ নিয়ে হাজির হয়েছে।
তিনি দেড়শো বছরের ব্যাপ্তি ঘেঁটে দেখিয়েছেন, কীভাবে ফিলিস্তিন অঞ্চলে ইহুদি অভিবাসনের স্রোত গড়ে ওঠে। বিশ শতকের শুরুতে ইউরোপের প্রেক্ষাপট, বিশেষ করে রাশিয়া আর পূর্ব ইউরোপে ইহুদিদের দুর্দশা—এসবের চিত্র দেখা যায় বইতে। আবার তিরিশের দশকে ইউরোপে বাড়তে থাকা ইহুদি-বিদ্বেষ, তার ফলে ফিলিস্তিনে অভিবাসনের আরও জোরালো ঢেউ—সব মিলিয়ে পাঠক হিসেবে চোখ এড়ানো কঠিন। পরে লেখক দেখিয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কীভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের জন্ম হলো, সেইসময় বেলফোর ঘোষণা বা ব্রিটিশদের ভূমিকার কথাও বাদ যাননি। আরব-ইসরায়েলি উত্তেজনা, সংঘাত—কিছুই বাদ পড়েনি।
বইয়ের একটা বড় অংশে লেখক মোসাদ, অর্থাৎ ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা, তাদের দুনিয়াজোড়া অপারেশন বা নানা দেশের সঙ্গে ইসরায়েলের টানাপোড়েনের গল্পও ছুঁয়েছেন। এখানে ইউরোপের ব্যাংকিং ইতিহাসও এসেছে—বিশেষভাবে রথসচাইল্ড পরিবার কেমন ছিল ইউরোপের অর্থনীতিতে, ব্যাংকিং ও পুঁজিবাজার বিকাশে তাদের কতটা ভূমিকা। কিন্তু এই জায়গায় আমি বলেই নিচ্ছি—রথসচাইল্ড পরিবারের ব্যাপারে অনেক ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ঘুরে বেড়ায়; তারা নাকি দুনিয়া শাসন করে। সত্যি বলতে, এসব দাবির বেশিরভাগই মূলধারার ইতিহাসবিদরা একেবারেই গ্রহণ করেন না, বরং খোদ ষড়যন্ত্র আর ইহুদি-বিদ্বেষ বলেই চিহ্নিত করেন। সুতরাং, বইটা পড়ে কেউ যদি মনে করেন এই কথাগুলো প্রতিষ্ঠিত সত্য, তা একদমই ঠিক হবে না।
সোহেল রানার বইটা শুধু একপাশীয় কোনো গল্প নয়—তাকে বলা যায়, প্রশ্ন ছোঁয়া হয়েছে, সেটা উত্তর খোঁজার চেষ্টাও হয়েছে। যেমন—ইউরোপে ইহুদি-বিদ্বেষের আসল চেহারা কী, আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থার গোড়াপত্তন কেমন, ফিলিস্তিন ম্যান্ডেট আমলে রাজনীতি কেমন ছিল, বা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ কেন—এসব প্রশ্নের আঁচ লেগেছে পাতায় পাতায়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাজনীতি, অর্থনীতি—সব মিলিয়ে বইটা অনেক দিক ছুঁয়েছে।
বইটা বেরিয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলার গার্ডিয়ান পাবলিকেশন্স থেকে। বাজারে খোঁজ নিয়েছেন? রকমারি, বইবাজার, বইপাঠাই—যেখানেই হাত দিন, পাবেন। গার্ডিয়ান তো ইতিহাস-রাজনীতি বিষয়ক অনেক বই-ই ছাপে, কিন্তু দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস যেন একটু বেশিই ঝড় তুলেছে তাদের লিস্টে।
মধ্যপ্রাচ্য, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বা ইহুদিবাদ নিয়ে বই পড়তে বসার আগে একটা কথা মাথায় রাখা দরকার—এগুলো ভয়ংকর স্পর্শকাতর আর খুবই বিতর্কিত বিষয়। ইতিহাসবেত্তা, গবেষক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক—অনেকেই একই ঘটনা একেকভাবে দেখেন। বিশেষ করে সেই পুরোনো, বহুল আলোচিত “ইহুদি নিয়ন্ত্রণ”-জাতীয় ষড়যন্ত্রের গল্পগুলো—মূলধারার ইতিহাস ওই জায়গাগুলো একদমই সমর্থন করে না; নারাও, বরং, এগুলো কাঠগড়ায় উঠেছে ইহুদি-বিদ্বেষ বলে। বইপাঠের সময় সেসব কী আর না ভেবে পারা যায়? আপনি যখন পড়বেন, প্রতিটি তথ্য-উপাত্ত একাধিক উৎস থেকে যাচাই করবেন, একটু সন্দেহের চোখে তাকাবেন—এটাইই একজন সচেতন পাঠকের কাজ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা শেষে—সোহেল রানার “দ্য কিংডম অব আউটসাইডারস” এমন এক বই, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি, ইতিহাস আর যুগান্তকারী অনেক ঘটনা ধরা পড়েছে এক মলাটে। লেখকের শ্রম জেগে আছে লেখার ভাঁজে ভাঁজে, অনেক বিতর্কিত বিষয়ে সাহস করে গেছেন, তবু দায়িত্ববান পাঠক হিসেবে আমাদের উচিত নানা দিক থেকে দেখার অভ্যাস রাখাই, তথ্য যাচাই করা, আর চোখ-কান খোলা রাখা। ইতিহাস যদি জানতে হয়, মনে রাখতে হয়—একক কোনো সত্য নেই; অনেকগুলো গল্প মিলেই তো পুরো দৃশ্যটা তৈরি হয়।

إرسال تعليق