![]() |
| ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা |
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভূমিকা
লেখক : সত্যেন সেন
প্রকাশনী : ফার্মা কেএলএম প্রাইভেট লিমিটেড কুলিকাতা
বিষয় : ইতিহাস ও ঐতিহ্য
আরো পরুন -
ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের ভুমিকা
ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা খুব বেশি হয়নি—মানুষ জানে, তবু পাঠ্যবইয়ে সে কথা প্রায় উঠে আসে না। অথচ সত্যেন সেনের মতো লেখকেরা এ বিষয়টা খোলাসা করে তুলেছেন। চলে আসি একটু পেছনে।
প্রাথমিক প্রতিরোধ
ব্রিটিশদের শাসনের শুরু থেকেই মুসলমানরা প্রতিবাদ করতে শুরু করেন, বিশেষ করে অষ্টাদশ শতকের শেষের দিক থেকে। তখন বাংলায় ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ হয়েছিল। এখানে মজনু শাহ, মুসা শাহরা সামনে ছিলেন মুসলিম ফকিরদের নিয়ে, আবার পাশে ছিলেন হিন্দু সন্ন্যাসীরাও। আসলে সবাই মিলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলেছিলেন।
পরে তিতুমীর বাঁশের কেল্লায় লড়েছেন কৃষক-তাঁতিদের নিয়ে। ওটা ছিল জমিদার আর ব্রিটিশ উভয়ের বিরুদ্ধেই সরাসরি যুদ্ধ। ফরায়েজি আন্দোলনের কথা বললেই হাজী শরীয়তউল্লাহ আর দুদু মিয়ার নাম চলে আসে—ওরা শুধু ধর্মীয় সংস্কার আনেননি, বরং কৃষক আর সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে এই সংগঠন গড়েছিলেন।
সিপাহি বিদ্রোহ ও পরে
১৮৫৭’র সিপাহি বিদ্রোহে মুসলিম সিপাহি, জমিদার, সাধারণ সবাই দলে দলে যোগ দিয়েছিলেন। দিল্লিতে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বিদ্রোহীদের প্রতীকী নেতা হন। বেগম হজরত মহল, বখত খান—এদের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা মানুষ এখনো মনে রাখে। এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলেও মুসলমানদের উপরে পড়ে সন্দেহের চোট, অনেক নেতা পরিবার বর্বর নিপীড়নের লক্ষ্য হয়ে যায়।
এরপর শুরু হয় ওয়াহাবি আন্দোলন। সৈয়দ আহমদ বেরেলভির নেতৃত্বে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলজুড়ে জোরালো ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম চলে।
বিংশ শতকের আন্দোলন
নতুন শতকে এসে মুসলমানরা আর শুধু ধর্ম নয়, রাজনীতিতেও সচেতন হলেন। খিলাফত আন্দোলন (১৯১৯-২৪)—মাওলানা মোহাম্মদ আলী, শওকত আলীর নেতৃত্বে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়ে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের এমন নজির তৈরি হল, গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন সঙ্গে নিয়ে সবাই মিলে আন্দোলন করলেন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ শুধু কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা নন; তিনি আজীবন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের স্বপক্ষে কণ্ঠ মিলিয়েছেন।
উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে খান আবদুল গাফফার খান (সীমান্ত গান্ধী) অহিংস আন্দোলনের ঝান্ডা তুলেছিলেন, তাঁর গড়া ‘খুদাই খিদমতগার’ সংগঠন আজও ইতিহাসে দৃষ্টান্ত।
বাংলার ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনেও দেখা যায় মুসলমান তরুণরা দলে দলে গোপন সংগঠনে যুক্ত হয়েছেন। কৃষক আন্দোলন, বিশেষত তেভাগা আন্দোলন—এসবেও ব্যাপক মুসলিম অংশগ্রহণ ছিল। সাধারণ মানুষ মৌলিক দাবি নিয়ে এক কাতারে দাঁড়িয়েছেন।
সত্যেন সেনের দৃষ্টিভঙ্গি
সত্যেন সেন বলেছিলেন, ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম আসলে কোনো একক ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ছিল না। কৃষক, শ্রমিক, সাধারণ মানুষ—হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে উপনিবেশিক শাসন আর জমিদারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে এক সাথে লড়েছেন। সেই ঐক্য স্বীকার করা না হলে, সত্যিটা আড়াল পড়ে যায়। বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি ব্রিটিশেরা পরিকল্পিতভাবেই করেছে, প্রকৃত ইতিহাস তাতে বেশির ভাগ সময়ই ঢেকে গেছে।
উপসংহার
সবকিছু মেলালে দেখা যায়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রতিটি পরতে মুসলমান সম্প্রদায় বড় ভুমিকা রেখেছে—ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে সিপাহি বিদ্রোহ, খিলাফত আন্দোলন, কৃষক বিদ্রোহ, সর্বত্র। এই সংগ্রামের ইতিহাস শুধু হিন্দু-মুসলিম ঐক্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের লড়াইয়ের দৃষ্টান্ত হিসেবে চিরকাল রয়ে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন